সময়পত্র ডেস্ক: চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একই মঞ্চে বসতে যাচ্ছেন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বার্ষিক সম্মেলনে। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে দুই দিনের এ সম্মেলন। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং চলমান বিভিন্ন যুদ্ধ পরিস্থিতি এবারের সম্মেলনে গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এসসিওর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এবারের সম্মেলনটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পঞ্চম বছরে গড়ানো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে এসসিওভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা কতটা জোরদার করা সম্ভব হবে, সেটিও সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কারা থাকছেন সম্মেলনে?
এবারের এসসিও সম্মেলন হচ্ছে বিশকেকে। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য—‘টুগেদার ফর সাসটেইনেবল পিস, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্রসপারিটি’, অর্থাৎ টেকসই শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে এগিয়ে চলা।
শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদির পাশাপাশি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, বেলারুশ ও কাজাখস্তানের নেতারাও এতে অংশ নেবেন।
এছাড়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং আসিয়ান মহাসচিব কাও কিম হর্নেরও সম্মেলনে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
২৫ বছরে কতটা বদলেছে এসসিও?
১৯৯৬ সালে ‘সাংহাই ফাইভ’ নামে এসসিওর যাত্রা শুরু হয়। চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান মিলে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সীমান্ত বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে এই জোট গড়ে তোলে।
২০০১ সালের জুনে সংগঠনটির পরিধি বাড়িয়ে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও গঠন করা হয়। তখন উজবেকিস্তানও এতে যোগ দেয় এবং বেইজিংয়ে সংগঠনটির সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়।
২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান পূর্ণ সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়। এরপর ২০২৩ সালে ইরান এবং ২০২৪ সালে বেলারুশ পূর্ণ সদস্য হয়। এছাড়া সৌদি আরব, কাতার, মিশর, তুরস্ক, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও কম্বোডিয়াসহ ১৪টি দেশ এসসিওর গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ অংশীদার।
বর্তমানে এসসিওভুক্ত দেশগুলোতে বিশ্বের প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ বসবাস করে। বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ২৩ শতাংশও তাদের নিয়ন্ত্রণে।
এসসিও কি পশ্চিমাবিরোধী জোট?
নিরাপত্তা জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও সময়ের সঙ্গে এসসিওর কার্যক্রম বাণিজ্য, অর্থনীতি, যোগাযোগসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিস্তৃত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসসিওকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বা পশ্চিমাবিরোধী জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। চীন, রাশিয়া ও ভারতের স্বার্থের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ফলে সংগঠনটি মূলত এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নিজেদের কৌশলগত পরিসর ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা তুলে ধরতে পারে।
চীন ও রাশিয়া এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য কম থাকবে। ভারতও একই লক্ষ্য অনুসরণ করছে না, তবে নয়াদিল্লিও এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা চায় যেখানে কোনো একক শক্তি একতরফাভাবে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে না পারে।
এবারের সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য
এসসিও সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এবারের সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
এশিয়ার দুই বড় অর্থনীতি ভারত ও চীনের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘ টানাপোড়েন তৈরি হলেও গত বছর থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির চাপ নয়াদিল্লিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের দিকে আরও আগ্রহী করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। ভারত-পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনাও সম্মেলনে আলোচনায় আসতে পারে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও নতুন ব্যাংক
নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি অর্থনৈতিক একীভূতকরণ ও আর্থিক সহযোগিতার কাঠামো নিয়েও এবারের সম্মেলনে অগ্রগতি হতে পারে।
গত বছর চীনের তিয়ানজিন সম্মেলনে এসসিও উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছিল। এবার কিরগিজস্তান এসসিও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এসসিও ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ও এসসিও ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি ঘটাতে চাইছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো চুক্তি ঘোষণা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
হরমুজ সংকটে বিকল্প বাণিজ্যপথ
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি বাজার ও আর্থিক খাতে।
এ পরিস্থিতিতে এসসিওর আলোচনায় নতুন বাণিজ্য ও পরিবহন করিডোর বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর (আইএনএসটিসি)। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে ভারতের মুম্বাই পর্যন্ত এই করিডোর ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বন্দরগুলোর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে।
মোদি ও পুতিনের সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আর্কটিক অঞ্চল দিয়ে চলা নর্দার্ন সি রুট নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
এছাড়া ইউরেশিয়াজুড়ে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন সহজ করতে ‘সিল্ক রোড স্টেশন’-এর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কি ঐকমত্য হবে?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে এসসিওভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পুরোপুরি ঐকমত্য নেই। রাশিয়া অধিকাংশ সদস্যকে নিজেদের অবস্থানের কাছাকাছি রাখতে সক্ষম হলেও ভারত তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। নয়াদিল্লি একদিকে শান্তির আহ্বান জানিয়েছে ও ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে, অন্যদিকে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনেছে।
এবারের সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ও পুতিনের মধ্যে আলাদা বৈঠক হতে পারে। সেখানে কৃষ্ণসাগরের পরিস্থিতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ইরান ইস্যুতে চীন-রাশিয়ার অবস্থান
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের বিষয়ে এসসিও তুলনামূলকভাবে বেশি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। সংগঠনটি শক্তি প্রয়োগের বিরোধিতা করে বিরোধগুলো আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতির আলোকে সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ভারত ইরানে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়ে এসসিওর একটি যৌথ বিবৃতিতে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
রাশিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। অন্যদিকে চীন ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। ফলে ইরান ইস্যুতে বেইজিং ও মস্কোর অবস্থান সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
ভারত-পাকিস্তান বিরোধও হতে পারে আলোচনায়
এসসিওর ভেতরে ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধ নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটির কাছে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের নিন্দা জানানোর দাবি করে আসছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে। অন্যদিকে পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদার।
কাশ্মীরসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা থাকায় সম্মেলনে এ বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর অর্থ কী?
বিশ্লেষকদের মতে, এসসিও সম্মেলনকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতির পুরোটা বোঝা যাবে না।
মধ্য এশিয়ার দেশগুলোও চীন ও রাশিয়ার প্রভাবের মধ্যে নিজেদের কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বহুমুখী সম্পর্কের পথে হাঁটছে। একইভাবে ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোয়াডে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনছে; অন্যদিকে চীন-প্রধান এসসিওতে থেকে মস্কো ও বেইজিংয়ের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ফলে বিশকেকের এবারের এসসিও সম্মেলন কেবল চীন, রাশিয়া ও ভারতের বৈঠক নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো কীভাবে নিজেদের বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চায়, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

