সাইফুল ইসলাম তানভীর:
“পালকি চলে! পালকি চলে! গগন তলে আগুন জ্বলে! স্তব্ধ গাঁয়ে আদুল গায়ে যাচ্ছে কারা রুদ্র সারা!” কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের এ পঙক্তি গ্রামীণ জীবনের হারিয়ে যাওয়া এক অনন্য ঐতিহ্যের ছবি তুলে ধরে। একসময় বিয়ের আয়োজন মানেই ছিল পালকি। লাজমাখা নববধূ, চারপাশে গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত এই বাহন। কিন্তু সভ্যতার বিবর্তন, প্রযুক্তির বিকাশ আর আধুনিকতার দাপটে পালকি এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চান্দহর ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের মো. আলতাফ হোসেন (৭০) আজও আঁকড়েআছেন পূর্বপুরুষের পেশায়। যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছেন পরিবারের পালকিগুলো। যেন তিনি ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী।
এক সময় বিয়ের আনন্দ উৎসবের অপরিহার্য অংশ ছিল পালকি। নববধূকে চার থেকে ছয়জন বেয়ারার ( ভেলধার) কাঁধে তুলে নিয়ে যেত দূরপথে। বহনের সময় তারা তাল মিলিয়ে গাইত “হুনহুনা হুনহুনা”। গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথে পালকির যাত্রা ঘিরে সৃষ্টি হতো উৎসবের আমেজ। সাধারণত তিন ধরনের পালকি ছিল। এরমধ্যে প্রচলিত সাধারণ পালকি, আয়না পালকি ও ময়ূরপঙ্খী পালকি।
আলতাফ হোসেন বলেন, “আগে বর-কনেকে পুরো পথজুড়ে পালকিতে বহন করা হতো। এখন কেবল বাড়ি থেকে গাড়ি পর্যন্ত বা গাড়ি থেকে বাড়ি পর্যন্ত নেওয়া হয়। এজন্য একবারে ভাড়া মেলে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকেও অনেকে ভাড়া নেন। তবে আগের মতো নিয়মিত চাহিদা নেই।” কণ্ঠে গর্বের্র সঙ্গে আক্ষেপের চিত্রও ফুটে ওঠে আলতাফ হোসেনের কন্ঠে। তিনি বলেন -“আমরা চার ভাই মিলে এখনো পৈত্রিক পেশা ধরে রেখেছি। কিন্তু ছেলে বা ভাইপোদের কেউ আর আসছে না। আমি চলে গেলে হয়তো মানিকগঞ্জে পালকির ইতিহাসও শেষ হয়ে যাবে।”
সিংগাইর সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক বেনিমাধব সরকার বলেন, “এখন বিয়েতে পালকির পরিবর্তে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, এমনকি হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয়। কিছু সৌখিন পরিবার ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করে, তবে পালকির দিন শেষ। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে পালকি একদিন কেবল লোকশিল্প জাদুঘর বা বইয়ের পাতায় টিকে থাকবে।” তিনি মনে করেন, পালকি শুধু বাহন নয়, গ্রামীণ সমাজ-সংস্কৃতির প্রতীক। সরকারি উদ্যোগে পালকি-ভিত্তিক পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। নইলে দ্রুত হারিয়ে যাবে শতবর্ষী এই ঐতিহ্য।
মানিকগঞ্জের সিংগাইরের শেষ পালকি এখন নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আলতাফ হোসেনের বুকে লালিত এই ঐতিহ্য হয়তো তার প্রজন্মের পরেই মিলিয়ে যাবে ইতিহাসে। যে পালকি একদিন ছিল আনন্দ, উল্লাস আর সামাজিক মর্যাদার প্রতীক, তা হয়তো শিগগিরই নতুন প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠবে শুধু গল্প বা স্মৃতিচারণার বিষয়।

