সময়পত্র ডেস্ক: স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় পেয়েছে। বর্ধিত এই সময়কে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণের প্রস্তুতি একই প্রক্রিয়ার অংশ। এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যাংক খাতের অস্থিরতা দূর করা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, টেকসই জ্বালানি নীতি প্রণয়ন এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকিসংক্রান্ত সূচকে ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে দেশটি। তবে কোভিড-১৯ মহামারি, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করে। পরে জাতিসংঘের প্লেনারি সভায় বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। এর ফলে চলতি বছরের নভেম্বরে নয়, ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে বাংলাদেশ।
তবে বাড়তি তিন বছর সময় পেলেও অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে দেশকে। যমুনা টেলিভিশনকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, এই সময়ের মধ্যে আর্থিক খাতের সংস্কার, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
তিনি আরও বলেন, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। গণরায়, অর্থনৈতিক কৌশল ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে এসব কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে আগের সময়ের তুলনায় কর-জিডিপি অনুপাতও বেড়েছে। তবে এ অগ্রগতির হিসাব চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের।
২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সুবিধা আর আগের মতো ভোগ করতে পারবে না। বিশেষ করে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা, বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি এবং সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে আসবে। ফলে তৈরি পোশাকসহ দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির প্রতিটি বছরকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীরের মতে, ব্যাংকিং ও জ্বালানি খাতের সংস্কার এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি খাতের সমস্যার কার্যকর সমাধান করা গেলে চলতি অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশ হতে পারে। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও মনে করেন, এলডিসি উত্তরণের আগে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ডিউ ডিলিজেন্স আইনসংক্রান্ত বিষয়েও প্রয়োজনীয় স্পষ্টতা আনা দরকার।
তিনি বলেন, আগামী তিন বছরে কোন সংস্কার কোন বছরে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নির্ধারণ করে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রস্তুতির জন্য পাওয়া অতিরিক্ত সময় যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
অর্থ উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এলডিসি উত্তরণ যেন শুধু আনুষ্ঠানিক অর্জনে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তা টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথ তৈরি করে—এটাই সরকারের লক্ষ্য। এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি এবং ছোট-বড় উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। সেই অনুযায়ী বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কৌশলের ভিত্তিতে সরকার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সংস্কার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ততা ও মালিকানা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশীদারত্বের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ, পরিকল্পনা ও কৌশল নির্ধারণের মাধ্যমেও এ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকে একটি টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরে পরিণত করা। তাঁর মতে, অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে বড়।
এদিকে জাতিসংঘ জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অন্য দেশগুলোর জন্য এ সিদ্ধান্তকে সাধারণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হবে না। পাশাপাশি ২০২৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও অগ্রগতি নিয়ে মধ্যবর্তী মূল্যায়ন করবে জাতিসংঘ। ওই মূল্যায়নের মাধ্যমে উত্তরণের পথে বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং বাকি সময়ে করণীয় সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

