নিজস্ব প্রতিনিধি: বিশ্বকাপের উদ্বোধনী বাঁশি বেজেছে বেশ কয়েকদিন আগেই। মাঠে নেমেছে একের পর এক দল, জমেছে প্রতিযোগিতার উত্তাপও। কিন্তু বাংলাদেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে যেন বিশ্বকাপের আসল শুরু রবিবার ভোরে। কারণ এ খেলায় মাঠে নামছে ব্রাজিল। এ ম্যাচে উভয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে স্নায়ু চাপ বেশি লক্ষ্য করার যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চার বছর ধরে জমিয়ে রাখা আবেগ, অপেক্ষা আর স্বপ্ন নিয়ে দেশের শহর থেকে গ্রাম, ছাদ থেকে চায়ের আড্ডা- সবখানেই এখন এক নাম, ব্রাজিল।
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের আকাশে উড়তে শুরু করে হলুদ-সবুজ আর আকাশি-সাদা পতাকা। বাড়ির ছাদ, অলিগলি, বাজার কিংবা মাঠ—সবখানেই শুরু হয় প্রিয় দলের সমর্থনে উৎসব। আর সেই উৎসবের সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে থাকে ব্রাজিল। তাই রোববার ভোর ৪টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচকে ঘিরে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনাও পৌঁছে গেছে তুঙ্গে।
গ্রুপ ‘সি’-এর বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মরক্কো। বিশ্বকাপ যাত্রার শুরুতেই কঠিন এক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে সেলেসাওরা।
দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে বিশ্বকাপ ট্রফির অপেক্ষায় রয়েছে ব্রাজিল। ২০০২ সালে সর্বশেষ শিরোপা জয়ের পর প্রতিটি আসরেই কোনো না কোনো ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের কাছে থেমে গেছে তাদের স্বপ্নযাত্রা। সেই হতাশার অধ্যায় পেছনে ফেলে এবার নতুন আশা নিয়ে মাঠে নামছে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তি।
এই নতুন অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন অভিজ্ঞ ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ মঞ্চে দলকে পরিচালনা করছেন তিনি। ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সফল এই কোচের হাত ধরেই ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্ন দেখছে সেলেসাওরা।
তারকায় ভরপুর ব্রাজিল দলে আক্রমণভাগে থাকছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া ও তরুণ বিস্ময় এন্দ্রিক। মাঝমাঠে কাসেমিরো এবং ব্রুনো গুইমারেসের অভিজ্ঞতা যেমন ভরসা দেবে, তেমনি রক্ষণে নেতৃত্ব দেবেন মারকুইনহোস। গোলপোস্টে থাকবেন নির্ভরতার প্রতীক আলিসন বেকার।
তবে প্রতিপক্ষ মরক্কোকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়া ‘আটলাস লায়ন্স’রা ইতোমধ্যেই নিজেদের বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ, দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক এবং লড়াকু মানসিকতা তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
মরক্কোর দলে রয়েছেন বিশ্বমানের রাইটব্যাক আশরাফ হাকিমি, মাঝমাঠের প্রাণভোমরা সুফিয়ান আমরাবাত এবং সৃজনশীল তারকা ব্রাহিম দিয়াজ। আর গোলপোস্টে ইয়াসিন বুনুর উপস্থিতি প্রতিপক্ষের জন্য সবসময়ই বাড়তি চ্যালেঞ্জ।
দুই দলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে একমাত্র দেখা হয়েছিল ১৯৯৮ সালের আসরে। সেবার ৩-০ গোলের জয় পেয়েছিল ব্রাজিল। তবে সেই পরিসংখ্যান বর্তমান বাস্তবতায় খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না। গত কয়েক বছরে মরক্কো নিজেদের এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে তারা যেকোনো পরাশক্তির জন্যই হুমকি।
কাগজে-কলমে গ্রুপ ‘সি’-এর সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দল ব্রাজিল ও মরক্কো। ফলে নকআউট পর্বের পথ সহজ করতে এই ম্যাচের গুরুত্বও অনেক বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে চাইবে ব্রাজিল, আর মরক্কো সুযোগ খুঁজবে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে।
ম্যাচটির অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও আশরাফ হাকিমির সরাসরি লড়াই। বিশ্বের অন্যতম সেরা উইঙ্গারের গতি ও ড্রিবলিংয়ের বিপরীতে থাকবে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুলব্যাকের রক্ষণশৈলী। এই দ্বৈরথই হয়তো নির্ধারণ করে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ভোরের এই ম্যাচ কেবল একটি বিশ্বকাপ ম্যাচ নয়, এটি আবেগ, উন্মাদনা এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক মিলনমেলা। কোটি হৃদয়ের দল ব্রাজিল কি হেক্সা মিশনের প্রথম ধাপ সফলভাবে পেরোতে পারবে, নাকি মরক্কো আবারও বিশ্বমঞ্চে নতুন চমকের জন্ম দেবে সেই উত্তর মিলবে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলো ঝলমলে রাতে।

