সাইফুল ইসলাম তানভীর:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী বাছাই, জোটের সমীকরণ, প্রতীক ও প্রচারের জোর যতটা আলোচনায়, তার চেয়েও নীরবে কিন্তু গভীরভাবে কাজ করছে একটি মৌলিক বিষয়—ভোটার উপস্থিতি।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে বেশিরভাগ আসনে কে জিতবে আর কে হারবে, তার বড় ফয়সালা নির্ধারিত হতে পারে ব্যালট বাক্সে কত মানুষ উপস্থিত হন, সেই সংখ্যার ওপরই।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভোটার উপস্থিতি ও নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যে একটি স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৮৬ শতাংশ। সে নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ছিল তুলনামূলকভাবে সুস্পষ্ট এবং বিজয়ী জোট পায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। বিপরীতে, ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি সরকারি হিসাবে ৪০ শতাংশের নিচে নেমে আসে; অনেক বিশ্লেষকের মতে প্রকৃত হার ছিল আরও কম। এর ফলে অংশগ্রহণমূলক সংকট ও নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি, যদিও এই হার নিয়েও বিরোধী দল ও পর্যবেক্ষকদের একাংশ প্রশ্ন তোলে। তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—ভোটার উপস্থিতি যত বেশি হয়, নির্বাচনী ফলাফল তত বেশি শক্ত ভিত্তি পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার উপস্থিতির সঙ্গে নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলারও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যেসব ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম থাকে, সেসব কেন্দ্রে ভোট কারচুপি, প্রভাব বিস্তার ও বিশৃঙ্খলার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। বিপরীতে, ভোটার উপস্থিতি বেশি হলে কেন্দ্রগুলো স্বাভাবিকভাবেই জনসমাগমপূর্ণ থাকে, নজরদারি জোরদার হয় এবং অনিয়মের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জয়-পরাজয়ের অঙ্কে—অনেক ক্ষেত্রে অল্প ব্যবধানে এগিয়ে থাকা প্রার্থীর ফলাফলও সম্পূর্ণ পাল্টে যেতে পারে।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ—এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি বাস্তব কারণ।
প্রথমত, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটির বেশি। এর মধ্যে তরুণ ভোটারের অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণ ভোটাররা যদি ব্যাপকভাবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন, তাহলে প্রচলিত ভোটের সমীকরণ বদলে যেতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, যেসব আসনে তরুণ ভোটারের উপস্থিতি ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
দ্বিতীয়ত, গ্রাম ও শহরের ভোটার উপস্থিতির ব্যবধানও এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচন কমিশনের পূর্ববর্তী তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় গড় ভোটার উপস্থিতি শহরের তুলনায় ৮ থেকে ১২ শতাংশ বেশি। শহুরে ভোটারদের অনাগ্রহ বা ভোটবিমুখতা কাটানো না গেলে, গ্রামীণ ভোটই অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মতো মহানগর-সংলগ্ন আসনগুলোতে ভোটার উপস্থিতির সামান্য ওঠানামাও ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
তৃতীয়ত, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে ভোটার উপস্থিতির সামান্য পরিবর্তনও বড় ব্যবধান তৈরি করতে পারে। নির্বাচন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৭০টি আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ছিল ১০ হাজার ভোটের কম। এসব আসনে ভোটার উপস্থিতি মাত্র ৫ শতাংশ বাড়া বা কমার অর্থই হতে পারে ফলাফলের সম্পূর্ণ উল্টে যাওয়া। এখানে প্রার্থীর প্রচারের জোর নয়, বরং ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে আনতে পারার সক্ষমতাই হয়ে ওঠে প্রধান নির্ধারক।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের দিকে নজর দিচ্ছেন সেটা হলো – রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের উপস্থিতি। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগের সংগঠনিক কাঠামো নিষিদ্ধ হলেও এর সমর্থক গোষ্ঠী দেশের বিভিন্ন এলাকায় সামাজিকভাবে এখনও সক্রিয়। এই ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে কতটা উপস্থিত হন, নাকি ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন—তার ওপর সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতির চিত্র উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভোটব্যাংক শক্তিশালী ছিল, সেখানে এই সমর্থক ভোটারদের অংশগ্রহণ বা অনুপস্থিতি জয়-পরাজয়ের হিসাব নতুনভাবে লিখে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সবশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, দলের সাংগঠনিক শক্তি কিংবা প্রচারের জোর যতই থাকুক না কেন, ভোটার উপস্থিতি যদি প্রত্যাশিত মাত্রায় না থাকে, তাহলে সেই সব হিসাব ভেস্তে যেতে পারে। এবারের নির্বাচন তাই কেবল প্রতীকের লড়াই নয়; এটি মূলত একটি উপস্থিতির পরীক্ষা—যেখানে ভোটার অংশগ্রহণ যেমন জয়ের চাবিকাঠি, তেমনি স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা ও বৈধতারও অন্যতম প্রধান নির্ধারক।

