ডেস্ক রিপোর্ট: শৈশবে একসময় বুঝে গিয়েছিলাম, সান্তা ক্লজ আসলে কল্পনার চরিত্র। সেই উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়েছিল শৈশবের বিশ্বাসের একটি বড় অংশ। বহু বছর পর, এই বড়দিনের মৌসুমে এসে অনেক আমেরিকান আবারও একই রকম ভাঙা স্বপ্নের মুখোমুখি—তবে এবার লাল পোশাকের মানুষটি সান্তা নন, তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ক্ষমতায় ফেরার প্রায় এক বছর পূর্তির পথে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প তাঁর দেওয়া বড় প্রতিশ্রুতিগুলোর খুব কমই বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন। ব্যতিক্রম বলতে অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর দমননীতি, যা ছুটির আনন্দের বদলে দেশজুড়ে এক ধরনের পুলিশি আতঙ্ক তৈরি করেছে।
রয়টার্স–ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ শতাংশে। সাধারণ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে নিত্যপণ্যের চড়া দামে। খাবার, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ—সবকিছুর খরচ বেড়েই চলেছে। ফেডারেল সরকার শাটডাউনের সময় লাখো মানুষ চাকরি হারানোর ভয় আর অনাহারের আশঙ্কায় দিন কাটিয়েছে। অথচ ‘আমেরিকাকে আবার মহান করো’ স্লোগানের সঙ্গে এই বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি শুল্ক নীতির কারণে নিয়োগ দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন অনেক উদ্যোক্তা। বেকারত্বের হার বেড়ে প্রায় পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাস্তবে যেখানে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে, সেখানে ট্রাম্প নিজের কল্পনার জগতে অর্থনীতিকে দিচ্ছেন ‘এ+++++’ নম্বর। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের অভিযোগকে তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন রাজনৈতিক ‘ভুয়া গল্প’ বলে।
যুক্তরাষ্ট্র কখনোই সাধারণ মানুষের জন্য সস্তা দেশ ছিল না। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলই ভিন্ন মতাদর্শের দাবি করলেও বাস্তবে তারা একই ব্যবস্থার রক্ষক। এই ব্যবস্থায় বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশে দারিদ্র্য, বর্ণবাদ ও পুলিশি সহিংসতা এখনো বাস্তব সত্য।
কেনটাকির লুইসভিলে সাম্প্রতিক এক সুপারমার্কেট কেনাকাটায় কয়েকটি নিত্যপণ্যের জন্যই গুনতে হয়েছে আড়াই শ ডলারের কাছাকাছি—যা অন্য দেশে এক মাসের বাসাভাড়ার সমান। তাও বাজারভর্তি ছিল না, ছিল না বিলাসী কিছুই।
এই শহরই একসময় আলোচনায় আসে নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ নারী ব্রিওনা টেলর হত্যার ঘটনায়। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও শাস্তির নমুনা আজও যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে।
এদিকে বিচার বিভাগের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে। যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নথি হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা। প্রকাশিত নথির বড় অংশ কালো করে ঢেকে দেওয়াও নতুন করে ক্ষত তৈরি করেছে।
দেশের ভেতরের এই অস্থিরতার মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী ভূমিকা অব্যাহত। ভেনেজুয়েলার আশপাশে সামরিক তৎপরতা, তেলবাহী জাহাজ জব্দের অনুমতি, এমনকি যুদ্ধের সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেননি ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সম্পদ ‘চুরির’ অভিযোগ তুলেছেন।
অন্যদিকে গাজায় ইসরায়েলের চলমান হত্যাযজ্ঞ থামেনি। কথিত যুদ্ধবিরতির আড়ালে এই সহিংসতায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রয়েছে—ট্রাম্প হোক বা তাঁর ডেমোক্র্যাট পূর্বসূরি।
সব মিলিয়ে এই বড়দিনে উৎসবের আনন্দ খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রতিবার বড়দিন আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু এই শীতের ছুটিতে বহু মানুষের কাছে বাস্তবতা শুধু হতাশা আর ভাঙা প্রতিশ্রুতির গল্পই হয়ে থাকে।

