সাইফুল ইসলাম তানভীর:
শীত এলেই গ্রাম-শহরের বাজারে বেড়ে যায় খেজুর গুড়ের চাহিদা। পিঠা-পায়েসসহ নিত্য খাবারে ব্যবহৃত এই গুড় বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বাজার থেকে টাকা দিয়ে যে খেজুর গুড় কিনে মানুষ খাচ্ছে, সেটি কি সত্যিই খাঁটি? নাকি অজান্তেই গ্রহণ করছে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া বিষ?
বিশেষজ্ঞ ও গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র—বাজারে বিক্রি হওয়া খেজুর গুড়ের একটি বড় অংশই ভেজাল। চিনি, কৃত্রিম রং, স্টার্চ, ফরমালিনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে তথাকথিত ‘খেজুর গুড়’, যাতে আসল খেজুরের রস নামমাত্র কিংবা একেবারেই নেই।
পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট ভেজালের বিস্তার
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শীত মৌসুমে বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খেজুর গুড়েই ভেজালের উপস্থিতি রয়েছে। পরীক্ষায় এসব গুড়ে অনুমোদনহীন রাসায়নিক, অতিরিক্ত চিনি ও রঙ ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
চিকিৎসকদের তথ্যমতে, দেশে গ্যাস্ট্রিক, লিভার ও কিডনি-সংক্রান্ত রোগের প্রায় ৪০ শতাংশের পেছনে খাদ্যে ভেজাল একটি বড় কারণ। শিশু, ডায়াবেটিস রোগী ও বয়স্কদের জন্য ভেজাল খেজুর গুড় বিশেষভাবে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ:
খরচের হিসাবেই ধরা পড়ে ভেজালের সত্য:
গাছি ও খেজুর রস সংগ্রহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খাঁটি খেজুরের রস দিয়ে ১ কেজি বিশুদ্ধ গুড় তৈরি করতে রস, গাছির পারিশ্রমিক ও জ্বালানি মিলিয়ে কমপক্ষে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা খরচ হয়।
অথচ বাজারে ৭০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ‘খাঁটি খেজুর গুড়’ নামে বিপুল পরিমাণ গুড় বিক্রি হচ্ছে। বাস্তব খরচের সঙ্গে এই দামের ব্যবধানই প্রমাণ করে—বাজারের অধিকাংশ গুড়ই আসলে খাঁটি নয়।
রাসায়নিক ‘হাইড্রোজ’: নীরব ঘাতক:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভেজাল গুড় তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে শিল্প রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট, যা ‘হাইড্রোজ’ নামে পরিচিত। এটি মূলত বস্ত্র ও চামড়াশিল্পে ব্যবহৃত হয়। খাদ্যে এর ব্যবহার সরাসরি বিষ প্রয়োগের শামিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের যৌথ গবেষণায় (২০১৪) দেখা গেছে, হাইড্রোজ-মিশ্রিত গুড় কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে, রক্তে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বাড়িয়ে দেয় এবং যকৃৎ বিকল হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। পাশাপাশি এতে মেশানো হয় বস্ত্রের রঙ, ফরমালিন, চুন ও আটা—যা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের কারণ।
উৎপাদনের তুলনায় বাজারে গুড়ের বন্যা:
জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে খেজুরগাছের সংখ্যা কমছে। বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় বাজারে গুড়ের সরবরাহ বহুগুণ বেশি। অনলাইন ও অফলাইন বাজারে ‘শতভাগ খাঁটি’ দাবিতে প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি গুড় বিক্রি হচ্ছে, যা মূলত ভেজাল কারখানার উৎপাদন।
নজরদারির দুর্বলতা:
ভেজাল গুড় বাজারে প্রকাশ্যেই বিক্রি হলেও এর বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান চোখে পড়ে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে কিছু গুড় ধ্বংস হলেও উৎপাদন ও সরবরাহ চক্র অক্ষত থেকে যায়। ফলে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
• খেজুর গুড়ের জন্য বাধ্যতামূলক
মান ও লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
• বিএসটিআই ও বিএফএসএর নিয়মিত ল্যাব টেস্ট ও টাস্কফোর্স অভিযান জরুরি।
• ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও কারাদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে।
• গাছিদের সমন্বয়ে সমবায়ভিত্তিক সরাসরি বাজার সংযোগ গড়ে তুলতে হবে।
• ভোক্তাদের জন্য খাঁটি গুড় চেনার ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।
জাতীয় দায়িত্ব:
খেজুর গুড় শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়—এটি বাংলার কৃষিসভ্যতা ও সংস্কৃতির অংশ। এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করা সরকারের পাশাপাশি ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। সচেতন ক্রয় সিদ্ধান্তই পারে ভেজালচক্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।
অন্যথায়, আমরা প্রতিদিনই টাকা দিয়েবিষ কিনে খেতে থাকব—যার মূল্য দিতে হবে আমাদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।

