ডেস্ক রিপোর্ট:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগের মধ্যে দুটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুন্যাল।
সোমবার দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুন্যাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ রায় পাঠ শুরু করেন। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য ছিলেন। ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ের ছয় ভাগের সারসংক্ষেপ প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে পড়ার পর পৌনে তিনটার দিকে চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। একই মামলায় আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী মামুনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজসাক্ষী হয়ে সত্য উন্মোচন করায় তার সর্বোচ্চ শাস্তি কম হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে গণহত্যার দায়ে এ ধরনের রায় হলো।
রায় ঘোষণার পুরো প্রক্রিয়া বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও বড় পর্দায় বিচার কার্যক্রম দেখানো হয়। বর্তমানে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। মামলায় গ্রেপ্তার একমাত্র আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন ইতোমধ্যে অ্যাপ্রুভার হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।
রায়কে কেন্দ্র করে সারাদেশে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় পুলিশ, র্যাব, ডিবি, সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী মাঠে দায়িত্ব পালন করছে। ঢাকা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তায় সেনা মোতায়েনের জন্য সুপ্রিম কোর্ট থেকে সেনা সদরকে চিঠিও পাঠানো হয়েছে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঘোষিত লকডাউন ও শাটডাউনের সময়ে সম্ভাব্য নাশকতা—গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ ইত্যাদি—রোধে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও জুলাই পন্থী দলগুলোর নেতাকর্মীরাও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মোট ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার অভিযোগ দাখিল করে। এর মধ্যে দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠা তথ্যসূত্র, জব্দতালিকা ও অন্যান্য দালিলিক প্রমাণ চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠা এবং দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠায় শহীদদের তালিকার বিবরণ রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন চলাকালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন—বিশেষ করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি দমন-পীড়নের নির্দেশ দেন। এসব নির্দেশের ফলে দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত, অঙ্গহানি বা নির্যাতনের শিকার হন।

