সময়পত্র ডেস্ক: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলা হয় ‘রাজনীতির জাদুকর’। বারবার রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েও ক্ষমতায় ফিরে আসার নজির রয়েছে তাঁর। তবে এবার কি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটতে যাচ্ছে, নাকি আবারও ক্ষমতায় টিকে থাকার পথ খুঁজে নেবেন তিনি—এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ইসরায়েলের রাজনীতিতে।
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে আজ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোট চলবে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই দেশটির বিভিন্ন সম্প্রচারমাধ্যমে সম্ভাব্য ফলাফল প্রকাশ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
৭ অক্টোবরের হামলা, গাজা ও লেবাননে যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পর নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গত চার বছর ধরে কট্টর ডানপন্থি ও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের সমর্থনে সরকার পরিচালনা করছেন তিনি। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নয়, বরং ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জনসমর্থনে পিছিয়ে নেতানিয়াহু
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে দেখা গেছে, ২০২২ সালের পর থেকে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কমেছে। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকটের তুলনায়ও পিছিয়ে থাকতে পারেন তিনি। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করাও নেতানিয়াহুর জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিশ্লেষকেরা এখনই তাঁর রাজনৈতিক বিদায় নিশ্চিত বলে মনে করছেন না। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিডিওন রাহাতের মতে, তিনটি গোষ্ঠীর সমর্থন নেতানিয়াহুকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। গোষ্ঠীগুলো হলো কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি, কট্টর ডানপন্থি এবং তাঁর ব্যক্তিগত সমর্থকগোষ্ঠী।
কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের অনেকে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা। নেতানিয়াহুর শাসনামলে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়েছে।
রাহাতের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু এমন একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমর্থনবলয় গড়ে তুলেছেন, যার অনুসারীরা মনে করেন, ইসরায়েল পরিচালনার যোগ্য একমাত্র ব্যক্তি তিনিই। নেতানিয়াহুও নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে রাষ্ট্রের পরিচয়ের সঙ্গে এক করে উপস্থাপন করেন। ফলে সামরিক ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য বা ব্যর্থতার চেয়ে পরিচয় ও আদর্শের বিষয়টি অনেক ভোটারের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তাঁর সমর্থকদের একাংশের বিশ্বাস, ইসরায়েলে একটি ‘ডিপ স্টেট’ বা অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামো রয়েছে, যারা নেতানিয়াহুর বিরোধিতা করে। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল তাঁকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে ৭ অক্টোবরের হামলার মতো বড় ব্যর্থতার জন্যও তাঁকে এককভাবে দায়ী করা উচিত নয় বলে মনে করেন তাঁরা।
রাজনৈতিক কৌশলে দক্ষ নেতানিয়াহু
তেল আবিবের কাছাকাছি বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোনাথন রাইনহোল্ডের মতে, ইসরায়েলের ইতিহাসে নেতানিয়াহুর মতো দক্ষ রাজনীতিক আর কেউ ছিলেন না। প্রতিপক্ষকে কৌশলে পেছনে ফেলা এবং নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলার দক্ষতাই তাঁকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে রেখেছে।
তবে গত চার বছরে নেতানিয়াহু সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে অসন্তোষ বেড়েছে। বিচারব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগকে অনেকেই গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীতে জনবলের সংকট থাকা সত্ত্বেও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি সমাধান করতে পারেনি তাঁর সরকার।
এ ছাড়া কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অধ্যাপক রাইনহোল্ডের আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হলে এসব সমস্যা আরও গভীর হতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থায়ী অংশে পরিণত হতে পারে।
অতীতেও একাধিকবার ক্ষমতা হারিয়েছেন
রাজনৈতিক জীবনে এর আগেও একাধিকবার বড় সংকটের মুখে পড়েছেন নেতানিয়াহু। ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ইসরায়েলে চার দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২১ সালে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের উদ্যোগে গঠিত জোটের কাছে ক্ষমতা হারান তিনি।
এর আগে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নেতানিয়াহু। পরে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
এবার দুর্নীতির মামলার বিচারপ্রক্রিয়া, যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে সমালোচনা, আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন তিনি। সমালোচকদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের স্বার্থের চেয়ে জোটসঙ্গীদের রাজনৈতিক ও আদর্শিক লক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তাঁর সরকার।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা নিয়েও কথা বলেছেন নেতানিয়াহু। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প ক্রিপ্টো অর্থনীতি গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা করেছেন তিনি।
ট্রাম্পের সমর্থনেও ভোটারদের মনোভাবে বড় পরিবর্তন নেই
এদিকে, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছেন নেতানিয়াহু। তবে জনমত জরিপের ফলাফল থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, এই সমর্থন ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেনি।
গত ১৮ অক্টোবর ট্রাম্পের সমর্থন ঘোষণার পরদিন ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ঘোষণা তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না। ১৭ শতাংশ বলেছেন, এতে নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কমেছে। অন্যদিকে, প্রায় ১২ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সমর্থন লিকুদ পার্টিকে ভোট দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় করেছে।
একই জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গাদি আইজেনকটের প্রতি তুলনামূলক বেশি সমর্থন দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ৩৩ শতাংশ।
জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২১টি আসন পেতে পারে। বর্তমানে বিদায়ী পার্লামেন্ট নেসেটে দলটির আসনসংখ্যা ৩২। অন্যদিকে, আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি ২৪টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিরোধীদের দুর্বলতাও হতে পারে নেতানিয়াহুর শক্তি
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের বারাক লিডারশিপ সেন্টারের প্রধান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদি সোমারের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করছে না; বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সোমারের মতে, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে নেতানিয়াহুর ব্যর্থতা থাকলেও বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। তাঁর বিশ্লেষণ, বিরোধী দলগুলো সরকারের ব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং জনঅসন্তোষকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
সোমার মনে করেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট আসন হারালেও ইসরায়েলের রাজনীতিতে ডানপন্থি ঝোঁক, জোটসঙ্গীদের সঙ্গে জনমতের মিল এবং বিরোধী দলগুলোর দুর্বলতা তাঁকে আবারও ক্ষমতায় টিকে থাকার সুযোগ করে দিতে পারে।
একসময় নেসেটে ২৪টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতৃত্ব দেওয়া ইয়ার লাপিদের রাজনৈতিক প্রভাবও কমেছে। ভবিষ্যতে তাঁর দলের আসনসংখ্যা মাত্র দুটিতে নেমে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সোমার।
আবারও নির্বাচন, নাকি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ?
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত কোনো জনমত জরিপেই নেতানিয়াহু কিংবা বিরোধী জোটের সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ফলে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকেরা এখনো নিশ্চিত নন।
সম্ভাব্য পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন দুই বৃহত্তম দলের মধ্যে মধ্যপন্থি জোট গঠন অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া। এসব পরিস্থিতির যেকোনো একটিতে নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাজনীতি থেকে অবসরের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে ইতিমধ্যে জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও কৌশল কাজে লাগিয়ে তিনি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন কি না, নাকি এবারের নির্বাচনই তাঁর দীর্ঘ ক্ষমতার অধ্যায়ের অবসান ঘটায়।

