সময়পত্র ডেস্ক: রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বরাবরই আমার সিনেমা দেখার তালিকায় বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। সে কারণে কোস্তা গাভ্রাস, কেন লোচ কিংবা উপমহাদেশের মৃণাল সেন ও গোবিন্দ নিহালানির মতো নির্মাতাদের কাজ দেখার তালিকা থেকে বাদ পড়ে না। সিনেমার গল্প সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হলে তার সঙ্গে জীবনী ও ইতিহাসও পাশাপাশি চলতে থাকে। আর সেই গল্পের পটভূমি যদি হয় রুশ বিপ্লব এবং প্রধান চরিত্রে থাকেন ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ বইয়ের লেখক, তাহলে আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। বলছি, ১৯৮১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রেডস’ চলচ্চিত্রের কথা।
অক্টোবর বিপ্লব ও জন রিডের ইতিহাস
১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর রাশিয়ায় ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় এক ঐতিহাসিক ঘটনা। রাজধানী পেত্রোগ্রাদের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বলশেভিক পার্টির হাতে। তারা তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করে সমাজতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে ২৫ অক্টোবর সংঘটিত এই ঘটনাই ইতিহাসে ‘অক্টোবর বিপ্লব’ নামে পরিচিত।
মার্কিন সাংবাদিক ও সাহিত্যিক জন রিড এই বিপ্লব খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন। পেত্রোগ্রাদে উপস্থিত থেকে তিনি দেখেন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পালাবদল। নেভা নদীর জল, অরোরা যুদ্ধজাহাজ কিংবা স্মোলনি ইনস্টিটিউটের মতো স্থান ও স্থাপনা যেভাবে সেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে, তেমনি জন রিডও হয়ে ওঠেন বিপ্লবের প্রত্যক্ষদর্শী।
পরবর্তী সময়ে তিনি লেখেন ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ বা ‘টেন ডেজ দ্যাট শুক দ্য ওয়ার্ল্ড’। বইটি পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়। রাশিয়ায় বিজয়ী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নিয়ে লেখা বিশ্বসাহিত্যের প্রথম সত্যনিষ্ঠ বিবরণগুলোর একটি হিসেবে বইটিকে বিবেচনা করা হয়।
বিপ্লব, প্রেম ও আদর্শের দ্বন্দ্ব
‘টেন ডেজ দ্যাট শুক দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইয়ের লেখক জন রিডের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছে ‘রেডস’। এখানে তাঁর প্রেম, দাম্পত্য, লেখালেখি এবং আদর্শগত দ্বন্দ্বের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে জন রিডের স্ত্রী লুইজ ব্রায়ান্টের জীবন ও ভূমিকার মধ্য দিয়েও ফুটে উঠেছে বিপ্লবের চেতনা।
সিনেমাটির পুরো গল্প এখানে তুলে ধরার উদ্দেশ্য নেই। শুধু এটুকু বলব, ‘রেডস’ একদিকে যেমন অক্টোবর বিপ্লবের কথা বলে, অন্যদিকে তুলে ধরে দুজন মানুষের বারবার ফিরে আসা ভালোবাসা এবং সংগ্রামের জটিল বাস্তবতা। শান্তি, জমি ও রুটির স্বপ্নে বিভোর একজন লেখক বিপ্লব-পরবর্তী বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে কীভাবে ধাক্কা খান, সেই অভিজ্ঞতাও ছবিটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নির্মাণশৈলী ও সিনেমাটোগ্রাফি
অনেক বছর আগে ‘রেডস’ দেখেছিলাম। সিনেমাটি খারাপ লাগেনি। তবে ইতিহাসনির্ভর চলচ্চিত্রে পুরোনো দৃশ্যধারণ বা ঐতিহাসিক ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। আমার মনে হয়েছে, এ ধরনের উপাদানের আরও নিপুণ ব্যবহার করা গেলে বিপ্লবের উত্তাল পরিবেশ আরও শক্তিশালীভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হতো।
বহির্দৃশ্যের পরিমাণ বাড়ানো গেলে লাল রং হয়ে উঠতে পারত নতুন প্রভাতের প্রতীক। সিনেমাটোগ্রাফির ক্ষেত্রেও ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ও লং শটের ব্যবহার বেশি থাকলে বিশ্বব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেওয়া সেই বিপ্লবের বিশাল ক্যানভাস আরও পূর্ণতা পেত। ছবির ক্যামেরা প্রায়ই একই ধরনের জায়গা, বিশেষ করে স্টুডিওকেন্দ্রিক পরিবেশে ঘুরেফিরে এসেছে।
এ ছাড়া প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের সিনেমাটি অনেক দর্শকের কাছে দীর্ঘ মনে হতে পারে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে বিষয়টি বিরক্তিকর মনে হয়নি।
ওয়ারেন বেটির পরিচালনা ও অভিনয়
সিনেমাটির পরিচালক ওয়ারেন বেটি নিজেই অভিনয় করেছেন জন রিডের চরিত্রে। পরিচালনার কাজ খুব বেশি না করলেও ‘রেডস’-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
ওয়ারেন বেটি এক বিরল রেকর্ডের অধিকারী। একই চলচ্চিত্রের জন্য অভিনয়, চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও প্রযোজনা—এই চারটি পৃথক বিভাগে একাডেমি পুরস্কারের মনোনয়ন পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘রেডস’ সেই চলচ্চিত্রগুলোর একটি, যার মাধ্যমে তিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেন।
অভিনয়ের দিক থেকে ছবিটিতে বড় ধরনের সমালোচনার সুযোগ খুব একটা নেই। ওয়ারেন বেটি ও ডায়ানে কিটন দুজনই সমানতালে অভিনয় করেছেন। জন রিডের প্রিয়তমা স্ত্রী লুইজ ব্রায়ান্টের চরিত্রে কিটন ছিলেন অনবদ্য।
‘দ্য গডফাদার’ দেখার পর থেকেই ডায়ানে কিটনের অভিনয়ের প্রতি আমার আলাদা অনুরাগ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে ‘গডফাদার’ ট্রিলজি, ‘অ্যানি হল’ ও ‘ম্যানহাটান’-এ তাঁর অভিনয়ের সৌন্দর্য সেই ভালো লাগাকে আরও গভীর করেছে। ‘রেডস’-এও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
ছবিতে কিটনকে দেখা গেছে স্বাধীনচেতা এক নারীর ভূমিকায়। তাঁর ক্লান্ত অথচ অনুসন্ধিৎসু মুখভঙ্গি মাঝেমধ্যে ‘সানফ্লাওয়ার’ ছবির সোফিয়া লরেন কিংবা ‘দ্য ক্রেইন্স আর ফ্লাইং’-এর ভেরোনিকার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। দুই রোমান্টিক বিপ্লবীর বিপরীতে বাস্তববাদী চরিত্রে জ্যাক নিকলসনও ছিলেন যথারীতি দুর্দান্ত। এই অভিনেতা আমার ভীষণ প্রিয়।
রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের আড়ালে মানবিক গল্প
পরিশেষে, ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জলাভ’-এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলা যায়, রাজনৈতিক বিষয়বস্তু ছবিটির কেন্দ্রে থাকলেও নির্মাতা এখানে সরাসরি কোনো মতাদর্শ প্রচারের চেষ্টা করেননি। রাজনৈতিক তত্ত্বের চেয়ে বরং প্রধান চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, আবেগ ও দ্বন্দ্ব বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
সেই জায়গা থেকেই ‘রেডস’ কেবল অক্টোবর বিপ্লবের ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্র নয়; এটি একই সঙ্গে একটি মহাকাব্যিক প্রেমের গল্প। বিপ্লবের উত্তাল সময়ের মধ্যে মানুষের ভালোবাসা, আদর্শ, স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংঘাত এখানে একাকার হয়ে গেছে।
এ ধরনের চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ থাকলে এবং হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকলে ‘রেডস’ মিস করা সত্যিই অপরাধের মতো মনে হতে পারে।

