সময়পত্র ডেস্ক: চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুউচ্চ পাহাড় ও গভীর গিরিখাতের মাঝে নির্মিত বিশ্বের সর্বোচ্চ সেতুটি এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। বিশাল এই সেতু দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন অসংখ্য দর্শনার্থী। কেউ কাচের পর্যবেক্ষণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে গভীর গিরিখাতের দৃশ্য উপভোগ করছেন, কেউ সেতুর নিচে নির্মিত ঝুলন্ত পথে হাঁটছেন, আবার কেউ শত শত মিটার ওপর থেকে বাঞ্জি জাম্পের মতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন।
চীনের গুইঝৌ প্রদেশে অবস্থিত হুয়াজিয়াং গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন সেতুটি প্রকৌশলগত বিস্ময়ের পাশাপাশি রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর গোল্ডেন গেট সেতুর তুলনায় পানির পৃষ্ঠ থেকে প্রায় নয় গুণ বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এই সেতু।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া সেতুটি বেইপান নদীর ওপর ৬২৫ মিটার বা প্রায় ২ হাজার ৫১ ফুট উচ্চতায় নির্মিত। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ সেতু। সেতুটি নির্মাণের আগে গিরিখাত পেরিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগত। নতুন সেতুর ফলে সেই যাত্রার সময় কমে মাত্র দুই মিনিটে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার গ্রামীণ জনপদগুলো চীনের বিস্তৃত সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৩৩ লাখ পর্যটক সেতুটি দেখতে এসেছেন।
মেঘের কাছাকাছি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা
হুয়াজিয়াং গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন সেতুটি প্রায় ২ দশমিক ৯ কিলোমিটার বা ১ দশমিক ৮ মাইল দীর্ঘ। পাহাড়ের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল নীলাভ-সবুজ টাওয়ার সেতুটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। তবে এর আকর্ষণ শুধু উচ্চতা ও দৈর্ঘ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্যও এখানে রয়েছে নানা আয়োজন।
সেতুর কাঠামোর ভেতরে কাচের পর্যবেক্ষণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিচের গভীর গিরিখাত দেখার সুযোগ রয়েছে। আরও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার জন্য রয়েছে বাঞ্জি জাম্প এবং সেতুর সড়কপথের নিচে নির্মিত খোলা হাঁটার পথ। নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে দর্শনার্থীরা উচ্চতায় হাঁটার অভিজ্ঞতাও নিতে পারেন।
সম্প্রতি সেতুটিতে বাঞ্জি জাম্পের একটি দৃশ্য দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করার পর এক তরুণ সেতুর নিচে থাকা প্ল্যাটফর্ম থেকে শূন্যে ঝাঁপ দেন। প্রায় সাত সেকেন্ড ধরে গভীর গিরিখাতের দিকে নেমে যাওয়ার পর বাঞ্জি দড়ির টানে আবার ওপরে উঠে আসেন তিনি। এ সময় চারপাশে থাকা দর্শনার্থীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
অনেক পর্যটকের মতে, গিরিখাতের তলদেশ থেকে কয়েকশ মিটার ওপরে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা একেবারেই ব্যতিক্রমী। সেখান থেকে সেতুটির বিশালত্ব ও নির্মাণকৌশল আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়।
সেতুকে ঘিরে বদলে যাচ্ছে গ্রামের অর্থনীতি
হুয়াজিয়াং সেতুর প্রভাব শুধু পর্যটকদের রোমাঞ্চ কিংবা প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গিরিখাতের নিচে থাকা গ্রামগুলোর মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পরিবর্তন আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দা লিন গুওছুয়ানের কাছে সেতুটি তাঁর গ্রামের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। ইউনান, ঝেজিয়াং ও গুয়াংডং প্রদেশে কয়েক বছর শেফ হিসেবে কাজ করার পর গুইঝৌতে ফিরে আসেন তিনি। এরপর নিজের দাদা-দাদির বাড়িসহ গ্রামের কয়েকটি পুরোনো বাড়িকে পর্যটকদের থাকার উপযোগী আবাসনে রূপান্তর করেন।
তাঁর প্রত্যাশা ছিল, নতুন সেতুকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন বাড়বে এবং দুর্গম এই গ্রামেও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে। একসময় যে এলাকায় বাইরের মানুষের আসার তেমন কোনো কারণ ছিল না, সেখানে এখন পর্যটনকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে লিন জানান, শুরুতে তাঁদের আবাসনে মাত্র নয়টি কক্ষ ছিল। বর্তমানে তা বাড়িয়ে ৫২টি করা হয়েছে। এরপরও সব অতিথির থাকার ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ব্যবসারও প্রসার ঘটেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনা নববর্ষের নয় দিনের ছুটিতে সেতুর সার্ভিস এলাকায় তিন লাখের বেশি পর্যটক এসেছিলেন। এই সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলো শহরের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
লিন এখন স্থানীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পরিচিত মুখ। চীনে টিকটকের বিকল্প হিসেবে পরিচিত ডৌইনে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। সেতুকে পটভূমিতে রেখে গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরে নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ ও সরাসরি সম্প্রচার করেন তিনি।
লিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ভিডিও দেখে অনেকেই হোমস্টেতে থাকার জন্য কক্ষ বুক করেন। পাশাপাশি ভ্রমণের বিষয়ে পরামর্শও চান।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য এখন শুধু সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; অনলাইনে সম্ভাব্য পর্যটকদের কাছে পৌঁছানোও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
একসময় এই এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতা ছিল সীমিত। পরে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান চায়না মোবাইল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের সহযোগিতায় নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্থাপন করা হয় নতুন বেস স্টেশন।
হুয়াওয়ের চীনবিষয়ক কৌশল ও ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের সদস্য ঝৌ জিয়ানগুও বলেন, বিশাল সেতুটি যেমন মানুষের চোখে পড়ে, তেমনি ডিজিটাল জগতেও যোগাযোগের একটি সেতু প্রয়োজন। তাঁদের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সেই ভূমিকা পালন করছে।
সেতুর পাশে গড়ে উঠছে বিলাসবহুল হোটেল
গিরিখাতের ওপরের দিকে পর্যটকদের জন্য রয়েছে বিলাসবহুল আতিথেয়তার ব্যবস্থাও। গ্রামের পুরোনো বাড়ি সংস্কার করে তৈরি হোমস্টের পাশাপাশি ৮৩ কক্ষের ওনেমন্ট হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন সেতুকে ঘিরে পর্যটনশিল্প গড়ে তোলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হোটেলটি তৈরি করা হয়।
পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত হোটেলটিতে রয়েছে রেস্তোরাঁ ও চারপাশের দৃশ্য উপভোগের উপযোগী সুইমিং পুল। প্রতিটি অতিথিকক্ষ থেকেই সেতুটি সরাসরি দেখা যায়।
হোটেলটির বিপণন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাপক ছাও লুয়াওর মতে, পরিবর্তনটি শুধু পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পর্যটকেরা এখানে কতক্ষণ অবস্থান করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, পর্যটকেরা এখন আর শুধু সেতু দেখে চলে যান না, বরং এর আশপাশে রাত কাটানোর সুযোগও পাচ্ছেন। ফলে সেতুকেন্দ্রিক পর্যটন দ্রুত ঘুরে দেখে চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে রাতযাপনসহ আরও বিস্তৃত ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় রূপ নিচ্ছে।
চীনে আরও কত সেতু প্রয়োজন?
চীনে একের পর এক সেতু নির্মাণের ফলে প্রতিটি নতুন প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নির্ধারণ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। নতুন সেতু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটালেও সব প্রকল্প থেকে সমান সুফল পাওয়া যায় না।
বেইজিং নরমাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক লি লিন্না গুইঝৌ প্রদেশের ২৯৫টি উঁচু সেতু নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, এসব সেতুর কারণে জেলা পর্যায়ে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির গড় হার সময়ের সঙ্গে কমেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে উঁচু সেতুগুলো জেলা পর্যায়ে যোগাযোগের সুযোগ গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ বাড়িয়েছিল। তবে ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এই হার কমে প্রায় ৫ শতাংশে নেমে আসে। এর অন্যতম কারণ, বিস্তৃত এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠায় নতুন সেতুর মাধ্যমে যোগাযোগ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে।
লি লিন্না বলেন, প্রতিটি নতুন সেতু নির্মাণের ফলে যোগাযোগব্যবস্থায় যে অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া যায়, তা ক্রমেই কমে আসছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে চীনে বিশাল সেতু নির্মাণের যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, পশ্চিম চীনের দুর্গম ও তুলনামূলকভাবে অনুন্নত পাহাড়ি জেলাগুলোতে, যেগুলো গিরিখাত ও নদীর কারণে বিচ্ছিন্ন, সেখানে নতুন উঁচু সেতু নির্মাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও যোগাযোগের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।
গবেষকের মতে, একটি সেতুর অর্থনৈতিক মূল্যায়নের ধারণাও বদলাচ্ছে। আগে যাতায়াতের সময় কমানো, পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং মানুষ ও পণ্য পরিবহনের সুবিধা বাড়ানোই ছিল প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এখন হুয়াজিয়াংয়ের মতো সেতু নতুন একটি সুযোগ তৈরি করছে—এমন জায়গায় মানুষকে ভ্রমণে আকৃষ্ট করা, যেখানে যাওয়ার কথা তারা হয়তো আগে কখনো ভাবেনি।
লি লিন্না বলেন, ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে, এসব উঁচু সেতু কোথায় নির্মাণ করা হবে এবং প্রতিটি সেতু ঠিক কোন সমস্যার সমাধান করবে।
হুয়াজিয়াং সেতু চালুর প্রথম বছরে আসা লাখ লাখ পর্যটক দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যাতায়াতের পথ থেকে নিজেই পর্যটন গন্তব্য
গুইঝৌ ট্রান্সপোর্ট ইনভেস্টমেন্ট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপের হুয়াজিয়াং প্রকল্প কার্যালয়ের পরিচালক শিয়ে বোরানের কাছে সেতুটির প্রথম বছরটি বেশ কিছু স্মরণীয় অভিজ্ঞতায় ভরা। সেতুটি চালু হওয়ার পর সহকর্মীদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা এখনো তাঁর মনে রয়েছে।
কয়েক শতাব্দী আগে এই দুর্গম ভূপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে ব্যবসায়ী ও বণিকদের প্রায় এক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেত। এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষ শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে এখানে আসছেন গিরিখাত পেরিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য নয়, বরং পাহাড়ের মাঝে ঝুলে থাকা সেতুটির সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্মিত সেতুটিই এখন নিজেই হয়ে উঠেছে পর্যটকদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে হুয়াজিয়াং গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন সেতু চীনের অবকাঠামো উন্নয়নে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

