সাইফুল ইসলাম তানভীর:
মানিকগঞ্জ-২ (সিংগাইর–হরিরামপুর–সদরের আংশিক) সংসদীয় আসনে নির্বাচনী লড়াই এখন তুঙ্গে। এক উপজেলা থেকেই চার প্রার্থীর অংশগ্রহণ, জামায়াতে ইসলামের দলীয় প্রার্থী না থাকা এবং শেষ মুহূর্তে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হওয়ায় এই আসনের ভোটের সমীকরণে এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জয়-পরাজয়ের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে হরিরামপুর উপজেলার ভোট, পাশাপাশি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী না থাকায় দলটির সমর্থক ভোটাররাও ফলাফলে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারেন।
চার লাখ ৭২ হাজার ৬২২ ভোটারের এই আসনে সিংগাইর উপজেলাতেই বাস চার প্রার্থীর। ফলে নিজ উপজেলায় ভোট ভাগাভাগি হলেও হরিরামপুর উপজেলার এক লাখ ৪৪ হাজার ৫৯২ ভোট এবং মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দুই ইউনিয়নের ৪৮ হাজার ৪৭১ ভোটই নির্ধারণ করবে শেষ হাসি কার মুখে উঠবে।
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, ধানের শীষের প্রতীকে সাবেক শিল্পমন্ত্রী শামছুল ইসলাম খানের (নয়া মিয়া) ছেলে ও সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান (শান্ত),
জাতীয় পার্টির প্রার্থী লাঙ্গল প্রতীক সাবেক এমপি এস এম আব্দুল মান্নান, ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী দেয়াল ঘড়ি প্রতীকে খেলাফত মজলিসের মো. সালাউদ্দিন ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হাতপাখা প্রতীকে মোহাম্মদ আলী।
ভোটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি বিএনপি ও জাতীয় পার্টির দুই প্রার্থীর। জামায়াতে ইসলামের কোনো দলীয় প্রার্থী না থাকায় শুরুতে বিএনপি প্রার্থী শান্ত অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। তবে প্রতীক বরাদ্দের আগের দিন উচ্চ আদালতের রায়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এস এম আব্দুল মান্নানের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বদলে যায় পুরো চিত্র।
স্থানীয়দের মতে, গত ছয় মাস ধরে জামায়াতঘনিষ্ঠ নেতা ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল মাঠ চষে বেড়ালেও জোটগত কারণে প্রার্থী হতে না পারায় সেই ভোটের একটি বড় অংশ এখন দোদুল্যমান। অন্যদিকে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী মো. সালাউদ্দিন ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী তুলনামূলকভাবে নতুন মুখ হওয়ায় ভোটারদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা এখনও সীমিত।
চায়ের স্টল থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার আড্ডা—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শান্ত। তার পক্ষে কাজ করছে পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য, অতীত উন্নয়নের স্মৃতি এবং দীর্ঘদিন নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার বিষয়টি। ভোটাররা মনে করছেন, প্রয়াত শিল্পমন্ত্রী শামছুল ইসলাম খান (নয়া মিয়া)–এর আমলে সড়ক, বিদ্যুৎ ও সেতু নির্মাণে যে উন্নয়ন হয়েছিল, তার সুফল আজও মানুষ ভোগ করছে।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এস এম আব্দুল মান্নান তার এমপি থাকাকালীন পদ্মা নদীর ভাঙন রোধ, বালিরটেক সেতু নির্মাণ উদ্যোগসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা তুলে ধরছেন। পাশাপাশি বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে বিজয়ের আশায় রয়েছেন তিনি।
বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান শান্ত বলেন,
“বিএনপি ক্ষমতায় এলে কৃষকদের ন্যায্য মূল্যে সার ও কীটনাশক নিশ্চিত করা হবে, চালু করা হবে কৃষি বীমা ও ফ্যামিলি কার্ড। পাশাপাশি মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিতদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “আমার বাবা শামছুল ইসলাম খান সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে ছিলেন, অন্যায়-অবিচারকে প্রশ্রয় দেননি। আমিও সেই পথ অনুসরণ করে মানিকগঞ্জ-২ আসনকে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত করতে চাই।”
সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত—মানিকগঞ্জ-২ আসনে এবার কোনো একক ফ্যাক্টর নয়, বরং হরিরামপুরের ভোট, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটারদের অবস্থান এবং শেষ মুহূর্তের টার্নআউটই নির্ধারণ করবে কে হচ্ছেন বিজয়ী।

