ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম মহান ব্যক্তিত্ব হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা এবং নবী করীম (সাঃ)-এর অত্যন্ত আপনজন ও জামাতা। অসীম সাহসিকতার জন্য তিনি ‘শেরে খোদা’ (আল্লাহর সিংহ) এবং অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য ‘জ্ঞানের দরজা’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর বর্ণাঢ্য ও ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল জীবনের বিভিন্ন দিক নিচে আলোচনা করা হলো।
১. জন্ম ও বংশপরিচয়
ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম মহান ব্যক্তিত্ব হযরত আলী (রাঃ) হিজরতের আনুমানিক ২৩ বছর পূর্বে মক্কার পবিত্র কাবা ঘরের অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেন, যা ইতিহাসের এক বিরল ও অনন্য ঘটনা। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের সম্ভ্রান্ত বনু হাশিম গোত্রের সন্তান। তাঁর পিতার নাম আবু তালিব, যিনি ছিলেন মহানবী (সাঃ)-এর আপন চাচা এবং মাতার নাম ফাতিমা বিনতে আসাদ। অনন্য সাহসিকতার জন্য তাঁকে ‘আসাদুল্লাহ’ (আল্লাহর সিংহ) ও ‘হায়দার’ (সিংহ) উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং নবীজি ভালোবেসে তাঁকে ‘আবু তুরাব’ (মাটির পিতা) নামে ডাকতেন।
২. ইসলাম গ্রহণ ও শৈশব
শৈশব থেকেই হযরত আলী (রাঃ) নবী করীম (সাঃ)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ও স্নেহছায়ায় লালিত-পালিত হন। মক্কায় দুর্ভিক্ষের সময় নবীজি তাঁকে নিজের ঘরে নিয়ে আসেন, ফলে তিনি নবুয়তের আলোর খুব কাছাকাছি বড় হওয়ার সুযোগ পান। পুরুষদের মধ্যে বালকদের বেলায় তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। তিনি জীবনে কখনোই মূর্তিপূজা করেননি বা জাহেলিয়াতের কোনো পাপাচারে লিপ্ত হননি, এ কারণেই সম্মান জানিয়ে তাঁর নামের শেষে ‘কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু’ (আল্লাহ তাঁর চেহারাকে সম্মানিত করেছেন) বলা হয়।
৩. হিজরত ও নবীপ্রেম
নবীপ্রেম ও ত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন হযরত আলী (রাঃ) হিজরতের রাতে। মক্কার কাফেররা যখন নবীজি (সাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করে ঘর ঘেরাও করেছিল, তখন জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে আলী (রাঃ) নবীজির বিছানায় তাঁর চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলেন। নবীজি মদিনায় হিজরতের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর, আলী (রাঃ) পরের দিন সকালে মক্কাবাসীর গচ্ছিত আমানতগুলো অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে তাদের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেন এবং পরবর্তীতে মদিনায় হিজরত করেন।
৪. পারিবারিক জীবন
হিজরতের দ্বিতীয় বছরে তিনি নবী করীম (সাঃ)-এর আদরের কনিষ্ঠ কন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের ঘর আলো করে ইসলামের ইতিহাসের দুই মহান নক্ষত্র হযরত হাসান (রাঃ) ও হযরত হোসাইন (রাঃ) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের সংসার জীবন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধা ও ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল; নিজেদের ঘরে খাবার না থাকলেও তাঁরা সেই খাবার অভাবী ও ক্ষুধার্তদের দান করে দিতেন এবং নিজেরা অভুক্ত থাকতেন।
৫. জিহাদ ও বীরত্ব
রণাঙ্গনে হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন অকুতোভয় বীর এবং ইসলামের বিজয়ের অন্যতম রূপকার। তাবুক যুদ্ধ ব্যতীত তিনি নবীজির সাথে প্রায় সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধে কুরাইশ নেতাদের হত্যা, উহুদ যুদ্ধে মানবঢাল হয়ে নবীজিকে রক্ষা এবং খন্দকের যুদ্ধে আরবের বিখ্যাত যোদ্ধাকে পরাস্ত করার ঘটনা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। বিশেষ করে খায়বার যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী দুর্গ জয়ে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন তাঁর হাতে ঝান্ডা দেওয়া হয় এবং তিনি অলৌকিক শক্তি নিয়ে কামূস দুর্গের ভারী দরজা এক হাতে উপড়ে ফেলে মুসলমানদের বিজয় এনে দেন।
৬. জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য
তরবারির পাশাপাশি জ্ঞানের রাজ্যেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, যার স্বীকৃতি দিয়ে নবীজি (সাঃ) বলেছিলেন, “আমি জ্ঞানের শহর আর আলী হলো তার দরজা।” তিনি ছিলেন কুরআনের হাফেজ, শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকারক এবং ইসলামি ফিকহ শাস্ত্রের অগাধ পণ্ডিত। জটিল বিচারকার্য সমাধানে তাঁর প্রজ্ঞা ছিল প্রবাদতুল্য এবং আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্রের ভিত্তি তাঁর হাত ধরেই রচিত হয়েছিল। তাঁর জ্ঞানগর্ভ ভাষণ ও উপদেশবাণী সংকলিত ‘নাহজুল বালাগা’ গ্রন্থটি আজও সাহিত্য ও দর্শনের এক অনন্য নিদর্শন।
৭. খিলাফত ও শাসনকাল
হযরত উসমান (রাঃ)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম বিশ্বের এক চরম সংকটময় মুহূর্তে ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইসলামের চতুর্থ খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য তিনি মদীনা থেকে ইরাকের কুফায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। তাঁর খিলাফতকালে জ জামাল ও সিফফিনের মতো বেদনাদায়ক গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হলেও তিনি সর্বদা ন্যায়বিচার ও ইসলামি সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। শাসক হয়েও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সম্পদের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও আমানতদার।
৮. শাহাদাত বরণ
খারিজি সম্প্রদায়ের এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হন এই মহান খলিফা। ৪০ হিজরি সনের ১৯শে রমজান ফজরের নামাজের সময় কুফার মসজিদে পাপিষ্ঠ আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম বিষাক্ত তরবারি দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে। এই মারাত্মক আঘাতের বিষক্রিয়ায় দুই দিন পর ২১শে রমজান তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ইরাকের নাজাফ শহরে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর শাহাদাতের মাধ্যমে খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগের সমাপ্তি ঘটে।

