দীর্ঘ প্রায় ছয় দশক ধরে আলোচনার পর পদ্মা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের পথে এগোচ্ছে সরকার। আগামী মার্চ মাস থেকেই প্রকল্পের বাস্তব কাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা, যদিও বাস্তবায়নের সময় এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুরো প্রকল্পটি তিন ধাপে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পে আপাতত সম্পূর্ণ অর্থায়ন করা হবে সরকারি তহবিল থেকে। প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো বিদেশি ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তবে ভবিষ্যতে উন্নয়ন সহযোগীরা আগ্রহ দেখালে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনা হতে পারে।
আগামীকাল রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর গঙ্গার পানি ভাগীরথী-হুগলি পথে প্রবাহিত হওয়ায় বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে কৃষি উৎপাদন, মৎস্য সম্পদ, নৌ যোগাযোগ এবং নদীভিত্তিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে পানিপ্রবাহ বাড়ানো, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করাই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। এই ব্যারাজ বছরে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজবাড়ীর পাংশা এলাকাকে ব্যারাজ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট এবং ১৮টি আন্ডার স্লুইস গেট।
নৌ চলাচলের সুবিধার জন্য একটি নেভিগেশন লক নির্মাণ করা হবে। মাছের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে থাকবে দুটি ফিশ পাস। ব্যারাজের ওপর দিয়ে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলসেতু নির্মাণের পাশাপাশি ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। নির্মাণকাজের মান যাচাইয়ের জন্য স্থাপন করা হবে একটি আলাদা ল্যাবরেটরি এবং প্রকৌশলগত পরামর্শ দেবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদসহ বিভিন্ন সুপারিশ ডিপিপিতে যুক্ত করা হচ্ছে।
তবে পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন বিষয়ে সমঝোতা না হলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জটিলতা দেখা দিতে পারে। পর্যাপ্ত পানি না পেলে ব্যারাজের কার্যকারিতা কমে যাবে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।
ব্যারাজ নির্মাণ সম্পন্ন হলে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়ালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে পানিপ্রবাহ বাড়বে। এতে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে, যা কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, পাবনা, বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
প্রকল্প অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে প্রতি সেকেন্ডে অন্তত ৫৭০ ঘনমিটার পানি ছাড়া হবে। এর ফলে পলি জমা কমবে, নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসবে।

