ডেস্ক রিপোর্ট: সাভারের থানা রোডে অবস্থিত পরিত্যক্ত সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারকে ঘিরে একের পর এক নৃশংস ঘটনার রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। রবিবার (১৮ জানুয়ারি ২০২৬) দুপুরে ওই ভবনের ভেতর থেকে পুলিশ আবারও দুটি আগুনে পোড়া মরদেহ উদ্ধার করেছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, মরদেহ দুটি একজন নারী ও একটি শিশুর হতে পারে। দুর্গন্ধ ও পোড়া কিছুর গন্ধ পেয়ে স্থানীয়রা জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর দিলে সাভার মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে।
এই সর্বশেষ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়। কারণ, একই ভবন থেকে গত ছয় মাসে এ নিয়ে মোট পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার হলো। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগে গত বছরের ২৯ আগস্ট হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক যুবকের অর্ধগলিত মরদেহ, ১১ অক্টোবর এক অজ্ঞাত নারীর অর্ধনগ্ন লাশ এবং ১৯ ডিসেম্বর ভবনের টয়লেট থেকে আরেক ব্যক্তির আগুনে পোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় ভবনটি অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে তদন্তের অগ্রগতির অংশ হিসেবে পুলিশ মশিরুর রহমান খাঁন সম্রাট নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এলাকাবাসীর কাছে ‘সাইকো সম্রাট’ নামে পরিচিত এই ব্যক্তি পরিত্যক্ত ভবন এলাকায় সন্দেহজনকভাবে চলাফেরা করতেন। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের অবস্থান এবং অন্যান্য আলামতের ভিত্তিতে তাকে শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কিছু তথ্য দিয়েছেন বলে জানালেও পুলিশ জানিয়েছে, তার বক্তব্য যাচাই করা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত কিছু জানানো সম্ভব নয়।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত, মৃত্যুর সময় ও কারণ নির্ধারণের চেষ্টা চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মরদেহ পোড়ানোর আলামত থেকে এটি স্পষ্ট যে প্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সর্বশেষ উদ্ধার হওয়া নারী ও শিশুর ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
এ ঘটনায় প্রশাসনিক অবহেলাও সামনে আসছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌর মালিকানাধীন ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল। সেখানে কোনো স্থায়ী পাহারা, কার্যকর সিসিটিভি ব্যবস্থা কিংবা প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ছিল না। একাধিকবার ঝুঁকির বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এই সুযোগেই অপরাধীরা ভবনটিকে ব্যবহার করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তকারীদের ধারণা, নিহতদের অনেকেই সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ হতে পারেন—যাদের নিখোঁজ হওয়া অনেক সময় নজরে আসে না। এ বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়েই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি ক্ষোভ বাড়ছে। তারা দ্রুত ভবনটি সিলগালা, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পরিত্যক্ত সরকারি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে মামলার তদন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। উদ্ধার হওয়া সব মরদেহের পরিচয় শনাক্ত, প্রকৃত অপরাধী বা অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সেদিকেই তাকিয়ে আছে সাভারবাসী। নীরব দাঁড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত কমিউনিটি সেন্টার যেন একের পর এক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে, যার উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

