গত বছরের সেপ্টেম্বর। সাংবাদিকেরা জানতে চেয়েছিলেন, আলভারো আরবেলোয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবেন জাবি আলোনসো। তখন জাবি ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের মূল দলের কোচ, আর আরবেলোয়া ‘বি’ দল কাস্তিয়ার দায়িত্বে। খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ারে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে দীর্ঘ সাত বছর সতীর্থ ছিলেন তারা। আরবেলোয়ার ভাষায়, “জাবি আমার কাছে ভাইয়ের মতো।”
সেই বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই জাবি তখন বলেছিলেন, একদিন আরবেলোয়া রিয়ালের মূল দলের কোচ হবেন। তখনো জাবি–রিয়াল সম্পর্কের ফাটল প্রকাশ্যে আসেনি। তবে গত বছরের বড়দিনে ক্লাব সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ তাঁর ভাষণে জাবির নাম একবারও উচ্চারণ না করায় গুঞ্জন শুরু হয়—ভেতরে ভেতরে কিছু একটা ঠিক নেই।
এরপর ঘটনাপ্রবাহ দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাবির অধীনে রিয়ালের খেলায় ধারাবাহিকতা ছিল না, ড্রেসিংরুমে নিয়ন্ত্রণ হারানোর কথাও শোনা যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে বার্সেলোনার কাছে ৩–২ গোলে হারের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ক্লাব। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৭ মাস ১৭ দিনের মাথায় জাবিকে বরখাস্ত করে রিয়াল।
ম্যাচ–পরবর্তী পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে একটি দৃশ্য অনেকের নজর কেড়েছিল। জাবি আলোনসো ক্লাব সভাপতিকে আলিঙ্গন করতে এগোলে পেরেজ ছিলেন নির্বিকার ও ভাবলেশহীন। তখনই অনেকে আন্দাজ করেছিলেন—সেপ্টেম্বরে করা জাবির ভবিষ্যদ্বাণী বুঝি সত্যি হতে চলেছে।
ঠিক সেটাই ঘটল। জাবির জায়গায় রিয়ালের মূল দলের নতুন কোচ হিসেবে নিয়োগ পেলেন আলভারো আরবেলোয়া। চুক্তির মেয়াদ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো না হলেও স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর ধারণা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ‘বি’ দল থেকে সরাসরি তাঁকে মূল দলে আনা হয়েছে।
কে এই আলভারো আরবেলোয়া
স্পেনের সালামানকায় জন্ম আরবেলোয়ার। ২০০১ সালে ১৮ বছর বয়সে যোগ দেন রিয়াল মাদ্রিদের বয়সভিত্তিক দলে। কাস্তিয়া দলের হয়ে তিন মৌসুম খেলার পর ২০০১ সালের ১৪ অক্টোবর লা লিগায় মূল দলের হয়ে অভিষেক হয় তাঁর।
দুই দফায় রিয়ালের জার্সিতে খেলেছেন আরবেলোয়া। এর বাইরে লিভারপুল, দেপোর্তিভো লা করুনা ও ওয়েস্ট হামেও খেলেছেন তিনি। স্পেন জাতীয় দলের হয়ে পাঁচ বছরের ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ ও দুটি ইউরো জয়ের গৌরব অর্জন করেন। যদিও জাতীয় দলে নিয়মিত ছিলেন না, রিয়ালে ফুলব্যাক পজিশনে একসময় তিনি ছিলেন অপরিহার্য।
রিয়ালের ‘ডিএনএ’ কি তাঁর মধ্যে আছে?
খেলোয়াড়ি জীবনে মানসিকভাবে আগ্রাসী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবলার হিসেবে পরিচিত ছিলেন আরবেলোয়া। অবসর নেওয়ার তিন বছর পর, ২০২০ সালে রিয়ালের অনূর্ধ্ব–১৪ দলের কোচ হিসেবে তাঁর কোচিং ক্যারিয়ার শুরু। এরপর অনূর্ধ্ব–১৯ দল এবং ২০২৫ সালের মে মাসে কাস্তিয়া দলের দায়িত্ব পান তিনি।
‘রাউল মাদ্রিদ’খ্যাত রাউল গঞ্জালেসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে কাস্তিয়ার দায়িত্ব নেওয়ার সময়ই স্পষ্ট হয়ে যায়—ক্লাবের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আরবেলোয়ার অবস্থান বিশেষ। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কা জানিয়েছে, রাউলের মধ্যে যেসব গুণাবলি পেরেজ প্রত্যাশা করেছিলেন, আরবেলোয়ার মধ্যে সেগুলোর প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখেছে ক্লাব।
মার্কার মতে, রিয়াল আরবেলোয়ার মধ্যে ‘নতুন জিদান’-এর ছায়া খুঁজে পেয়েছে। যেমন জিদান একসময় কাস্তিয়া থেকে উঠে এসে ইতিহাস গড়েছিলেন, তেমনি পথেই হাঁটছেন আরবেলোয়া।
খেলোয়াড় হিসেবে অর্জন
২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রিয়ালের জার্সিতে ২৩৮ ম্যাচ খেলে ৬ গোল করেন আরবেলোয়া। জেতেন আটটি ট্রফি—দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, দুটি কোপা দেল রে এবং একটি করে লা লিগা, স্প্যানিশ সুপার কাপ, ক্লাব বিশ্বকাপ ও উয়েফা সুপার কাপ।
কোচ হিসেবে সাফল্য
রিয়ালের বয়সভিত্তিক দলগুলোর কোচ হিসেবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন আরবেলোয়া। অনূর্ধ্ব–১৯ দলের কোচ হিসেবে ট্রেবল জেতানো, রেকর্ড সময়ে ১০০তম জয় এবং একাডেমিতে মোট ২০০ ম্যাচে ১৫১ জয়—সব মিলিয়ে তাঁকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত বলেই মনে করেছে ক্লাব।
কোচিং দর্শন
আরবেলোয়া বিশ্বাস করেন দ্রুতগতির, প্রেসিংভিত্তিক ‘ডিরেক্ট ফুটবল’-এ। লিভারপুলে ইয়ুর্গেন ক্লপের অধীনে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর কোচিং দর্শনে প্রভাব ফেলেছে। দ্রুত বল পুনরুদ্ধার, প্রতিপক্ষের বক্সের কাছে প্রেসিং এবং ত্বরিত আক্রমণ—এই তিনটি তাঁর দর্শনের মূল স্তম্ভ।
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে তিনি অগ্রগামী। অনুশীলনে ড্রোন ব্যবহার করে খেলোয়াড়দের গতি ও অবস্থান বিশ্লেষণ করেন। ক্লাব–সংশ্লিষ্টদের মতে, আরবেলোয়া রিয়ালের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও ড্রেসিংরুম সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা রাখেন।
‘মরিনিওস্তা’ মানসিকতা
বাকপটু, সাহসী এবং বিতর্ক এড়িয়ে না যাওয়া—এই বৈশিষ্ট্যগুলোয় অনেকেই তাঁকে জোসে মরিনিওর সঙ্গে তুলনা করেন। নিজেও একসময় নিজেকে ‘মরিনিওস্তা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন আরবেলোয়া। তবে নতুন দায়িত্ব নিয়ে তিনি পরিষ্কার করেছেন—
“আমি মরিনিও হওয়ার চেষ্টা করব না। আমি আলভারো আরবেলোয়া হয়েই থাকব।”
সামনে কী
আগামী বুধবার বাংলাদেশ সময় রাতে কোপা দেল রের শেষ ষোলোয় আরবাখেটের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে রিয়ালের মূল দলের কোচ হিসেবে ডাগআউটে অভিষেক হবে আরবেলোয়ার। তিনি কি হবেন ‘নতুন মরিনিও’, নাকি ‘নতুন জিদান’—এর উত্তর দেবে সময়ই।

