ডেস্ক রিপোর্ট: দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। ২৮ ডিসেম্বর শপথ নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর কার্যকাল শুরু হয়। নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতির কাছে বিচার বিভাগের সংস্কার ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইনজীবী নেতা ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
একান্ত আলাপচারিতায় তিনি দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, একজন আইনজীবী হিসেবে প্রধান বিচারপতির কাছে তাঁর একাধিক প্রত্যাশা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগে যে অনিয়ম ও শৃঙ্খলাহীনতা গড়ে উঠেছে, তা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টসহ নিম্ন আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ঘুষ ও দুর্নীতির চর্চা আইনজীবীদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে ফেলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যারিস্টার কাজল বলেন, বিগত সময়ে একাধিক বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এবং সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মুখোমুখি হয়ে কয়েকজন বিচারপতিকে বিদায় নিতে হয়েছে। তাঁর প্রত্যাশা, প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে বা তাঁর জানামতে যদি কোনো বিচারক দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের সংস্কারে শুধু প্রধান বিচারপতির উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, আইনজীবীদেরও এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে হবে। সৎ, মেধাবী ও যোগ্য আইনজীবীদের সহযোগিতার মাধ্যমে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। এ ধরনের সংস্কারে যারা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, জামিন বাণিজ্য বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত, তারা স্বাভাবিকভাবেই অসন্তুষ্ট হবে। তবে এই নিয়োগে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত আনন্দিত বলেও জানান ব্যারিস্টার কাজল।
সুপ্রিম কোর্ট সম্পর্কে প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ আদালত হতে হবে ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ মানদণ্ড। এখানে শ্রেণিভেদে বিচারের কোনো বৈষম্য থাকবে না—সব নাগরিক সমানভাবে ন্যায়বিচার পাবে। বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ সুপ্রিম কোর্টকে একটি কাঠামোগত পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বতন্ত্র সচিবালয়ের পূর্ণ বাস্তবায়নসহ আরও অনেক চ্যালেঞ্জ বর্তমান প্রধান বিচারপতির সামনে রয়েছে।
ব্যারিস্টার কাজল বলেন, দুর্নীতিমুক্ত বিচার প্রশাসন গঠন, দুর্নীতিবাজ বিচারক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’—এই নীতির বাস্তবায়নই প্রধান বিচারপতির কাছে আইনজীবীদের মূল প্রত্যাশা। এ ক্ষেত্রে সৎ ও যোগ্য আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির পাশে থাকবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী সাধারণত নিজেকে প্রচারের বাইরে রাখতে পছন্দ করেন, যা তাঁর একটি ইতিবাচক গুণ। তবে বিচার প্রশাসনকে কার্যকর করতে হলে বার ও বেঞ্চের মধ্যে সমন্বয় এবং আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ অত্যন্ত জরুরি। আইনজীবীদের সমস্যার বিষয়ে সরাসরি জানলে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান প্রধান বিচারপতির সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার প্রশংসা করে ব্যারিস্টার কাজল বলেন, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী অত্যন্ত সৎ, কর্মঠ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি। তাঁর বিচারিক জীবনে ন্যায়-নীতির প্রশ্নে কখনো বিচ্যুতি দেখা যায়নি। আপিল বিভাগে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বারবার বঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো অসন্তোষ বা ক্ষোভ প্রকাশ করেননি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধান বিচারপতির পিতা প্রয়াত বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরীও ন্যায়নিষ্ঠ ও সৎ বিচারক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত চরিত্র মিলিয়ে বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী বিচার বিভাগের নেতৃত্বে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করবেন বলেই তাঁর বিশ্বাস।
ব্যারিস্টার কাজল বলেন, প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি প্রশাসনিক বিষয়ে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন এবং বিচারপতিদের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ৪ জানুয়ারি থেকে নিয়মিত কোর্ট শুরু হলে তাঁর নেতৃত্বের বাস্তব প্রতিফলন আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

