সময়পত্র ডেস্ক: আগামী বছরের বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক দলের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা ও নৌকার ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণির একটি বইয়ে ‘প্রজ্ঞা’র প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) এক কর্মকর্তাকে বদলি করার পর আরও নয় কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দাঁড়িপাল্লার ছবি থাকা বইগুলো নতুন করে ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একটি পাঠ্যবই ছাপানোর আগে বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি ও কর্মকর্তাদের অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। সব ধাপের পর্যালোচনা শেষে বই ছাপানোর জন্য চূড়ান্ত করা হয়। ফলে ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি কীভাবে যুক্ত হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মূলত, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ বইটি পড়ানো শুরু হয়। ওই বইয়ে উপাত্ত ও তথ্য বিষয়ে জ্ঞানের পিরামিডের ধারণা বোঝাতে একটি চিত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা—এই চারটি স্তরের ধারণা ইংরেজি শব্দের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। প্রজ্ঞা বা ‘উইজডম’-এর প্রতীক হিসেবে ছিল দাঁড়িপাল্লার ছবি।
পরবর্তী সময়ে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে ‘উইজডম’-এর বাংলা অর্থ হিসেবে ‘বুদ্ধি’ লেখা হয়। পাশাপাশি প্রতীক হিসেবে যুক্ত করা হয় মানুষের অবয়বের ভেতরে পরমাণুর একটি মডেল। তবে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে ‘বুদ্ধি’ শব্দের পরিবর্তে আবার ‘প্রজ্ঞা’ লেখা হয় এবং প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয় দাঁড়িপাল্লার ছবি। এ নিয়েই নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত।
এনসিটিবির দাবি, ২০২৭ সালের বইয়ে ছবি পরিবর্তনের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফখরুল মাওলা বলেন, ‘কারিকুলাম পরিবর্তন হয়নি। যদি হতো, তাহলে সেটার সঙ্গে কিছু ইলাস্ট্রেশন পরিবর্তন হতে পারত। যেহেতু কারিকুলাম পরিবর্তন হয়নি, ফলে ওই জায়গায় দাঁড়িপাল্লা ছিল কি না, সেটি একটি বিষয়। তবে বড় কথা হলো, যেহেতু আমরা ২০২৬ সালের সংস্করণ পরিবর্তন করিনি, সেহেতু এটি আসার কথা ছিল না।’
তবে এনসিটিবির একটি অফিস আদেশে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ের ছবিগুলো পেশাদার শিল্পীদের দিয়ে নতুন করে আঁকানোর সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ কাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জোবায়েরকে। ঘটনার পর তাঁকে খাগড়াছড়িতে বদলি করা হয়।
এ বিষয়ে আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের বলেন, ‘উইজডমের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করাটা একাডেমিক অর্থে ভুল নয়। এটি একটি একাডেমিক পেপারের অংশ। বইটি নিয়ে কাজ করার সময় আমাদের মাথায় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেনি। এ ধরনের কোনো চিন্তাও আমাদের ছিল না।’
বইটি সংশোধন ও পরিমার্জনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আইসিটি এডুকেশন ফাউন্ডেশনের প্রধান মজিবুর রহমানসহ আরও আটজনকে। এনসিটিবির অন্তত ২০ কর্মকর্তা পাঁচটি ধাপে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের চূড়ান্ত মূল্যায়নের পরই বইটি ছাপানোর জন্য পাঠানো হয়।
আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের আরও বলেন, ‘যদি এটি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে এককভাবে আমি ভুল করিনি। কারণ, পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটি এসেছে। দিন শেষে গেটকিপার হচ্ছে সম্পাদনা বিভাগ। তারা বিষয়টি দেখবেন এবং এ জন্য তারাই দায়বদ্ধ।’
অন্যদিকে, বইটির বিভিন্ন ছবি ও অলংকরণ তৈরির দায়িত্বে ছিলেন এনসিটিবির খণ্ডকালীন শিল্পী সাইম আহমেদ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইন থেকে জ্ঞানের পিরামিডের একটি ছবি নেওয়া হয়েছিল, যেখানে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করা হয়।
সাইম আহমেদ বলেন, ‘ইলাস্ট্রেশনের জন্য আমাকে এনসিটিবি থেকে ডাকা হয়। কিছু কাজ আগে থেকেই করা ছিল, সেগুলো কিছুটা সংশোধন করতে হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করেও কিছু কাজ করতে হয়েছে। কর্মকর্তারা যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা সেভাবেই কাজগুলো করে জমা দিয়েছি।’
তবে পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের বিতর্ক শুধু দাঁড়িপাল্লার ছবিতেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন পাঠ্যবইয়ে নৌকার অন্তত ৮০টি ছবি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আগামী বছরের নতুন পাঠ্যবইয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবি ব্যবহার নিয়েও আলোচনা চলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলছেন, পাঠ্যবইয়ে প্রয়োজনে যেকোনো প্রতীক ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইকে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় বা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

