সাইফুল ইসলাম তানভীর: একটি বলের দিকে তাকিয়ে সমগ্র বিশ্ব। আর সেই তাকিয়ে থাকাটা হচ্ছে ফুটবলের বিশ্বকাপ খেলা। এ বিশ্বকাপ উপলক্ষেই উন্মাদনায় মেতেছে ক্রীড়ামোদী বিশ্ববাসী।
চার বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। আবারও শুরু হতে যাচ্ছে সেই আসর, যার জন্য কোটি কোটি মানুষ দিন গুনে থাকে। রাজনীতি, বিতর্ক, নিরাপত্তা, টিকিটের মূল্য কিংবা আয়োজন নিয়ে হাজারো আলোচনা পেছনে ফেলে বিশ্ব ফুটবল এখন একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। সেটা হলো কে হবে নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন?
২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন যুগের সূচনা। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে আয়োজিত হতে যাচ্ছে এই মহাযজ্ঞ। তিন স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে অনুষ্ঠিত হবে রেকর্ড ১০৪টি ম্যাচ। ফলে এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে দীর্ঘ বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপ মানেই স্মৃতির ভাণ্ডার। কাতারে লিওনেল মেসির বিশ্বজয়, রাশিয়ায় এমবাপ্পের উত্থান, ব্রাজিলে জার্মানির ৭-১ গোলের ঝড় কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকায় স্পেনের প্রথম শিরোপা। প্রতিটি আসরই জন্ম দিয়েছে নতুন কিংবদন্তির। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিতর্ক মুছে যায়, কিন্তু বেঁচে থাকে মাঠের নায়করা।
এবারও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবেন লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিন ইয়ামাল, জুড বেলিংহ্যাম, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা হ্যারি কেইনের মতো তারকারা। তবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এখানে অচেনা কোনো তরুণও রাতারাতি বিশ্ব তারকায় পরিণত হতে পারে।
নতুন ফরম্যাট বিশ্বকাপকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ১২টি গ্রুপ থেকে সরাসরি নকআউটে উঠবে ২৪ দল, আর সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল পাবে অতিরিক্ত সুযোগ। ফলে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত বেঁচে থাকবে উত্তেজনা। একটি গোল কিংবা একটি পয়েন্টই বদলে দিতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের ভাগ্য।
বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, প্রতিটি আসরেই জন্ম নেয় নতুন রূপকথা। ১৯৯০ সালে ক্যামেরুন, ২০০২ সালে সেনেগাল, ২০২২ সালে মরক্কো বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। এবার সেই গল্প লিখতে পারে উজবেকিস্তান, জর্ডান, কেপ ভার্দে কিংবা অন্য কোনো নবাগত দল।
মাঠের বাইরেও বিশ্বকাপ এক অনন্য আবেগের নাম। বাংলাদেশের মতো ফুটবলপাগল দেশে বিশ্বকাপ মানে উৎসব। কোটি মানুষের হৃদয়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বিভক্তি, ছাদজুড়ে পতাকা, গভীর রাতের আড্ডা আর প্রিয় দলের জন্য অগণিত প্রার্থনা। এসবই বিশ্বকাপকে কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং বৈশ্বিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত করেছে।
শক্তিমত্তা, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এবং সম্ভাব্য নকআউট সমীকরণ বিবেচনায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও মরক্কোকে ধরা হচ্ছে শিরোপার প্রধান দাবিদার। তবে বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হলো, এখানে কোনো সমীকরণই শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
ফুটবলবিশ্ব হয়তো অপেক্ষা করছে এক স্বপ্নের ফাইনালের। ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী কখনো বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হয়নি। যদি এবার সেই অসম্ভব বাস্তব হয়, তাহলে তা হবে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ম্যাচগুলোর একটি।
তবে শেষ পর্যন্ত সব ভবিষ্যদ্বাণীকে ভুল প্রমাণ করেই হয়তো কোনো নতুন শক্তি উঠে আসবে শিরোপার মঞ্চে। কারণ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সত্য হলো এখানে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
নতুন নায়ক জন্ম নেবে, পুরোনো কিংবদন্তিরা হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চকে বিদায় জানাবেন, আর কোটি কোটি শিশুর স্বপ্নে জায়গা করে নেবে নতুন কিছু নাম। সেই গল্পের সূচনা হতে যাচ্ছে আবারও। বিশ্ব ফুটবল প্রস্তুত, প্রস্তুত সমগ্র পৃথিবী।

