পঞ্চাশের দশকে এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বউ হয়ে এসেছিল মেহেরজান। বয়স কত আর হবে, বড়ো জোর এগারো/ বারো বছর। তার বাপ-মায়ের বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি নয়। মাইলখানেক বা আরও কিছু কম। দুই গ্রামের মাঝখানে ফাঁকা শস্যের মাঠ ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ঐ টুকুন বয়সে ছেড়ে আসা মা-বাপ আর ভাই-বোনের কথা মনে পড়লে সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া মেহেরজানের অন্য কোনো উপায় ছিল না।
মেহেরজানের শাশুড়ি ছিল অসম্ভব সুন্দরী এবং দজ্জাল প্রকৃতির। গায়ের রং একবারে দুধে আলতায় মেশানো। উঁচু নাক,সঢোল কপোল আর ঠোঁট দু’টো বাচা মাছের ঠোঁটের মতো লাল টুকটুকে। মেহেরজানের গায়ের রং শ্যামলার চেয়েও একটু বেশি কালো -আর নাকটি ছিল থ্যাবড়া। আর সেই কারণে ছেলের বউ দেখে তার শাশুড়ির মন ভরলো না। কারণে অকারণে সেকথাটি মেহেরজানকে বুঝাতে তার শাশুড়ি কার্পণ্য করতো না।
মেহেরজানের স্বামী এবং দেবরের চেহারার মধ্যেও তাদের মায়ের চেহারার ছাপ ছিল। সুন্দর চেহারার সাথে সৃষ্টি কর্তা তাদের শরীরে মর্জি মেজাজও যথেষ্ট পরিমাণে দিয়েছিলেন। তার দেবর খেতে বসে তরকারি যদি তার মুখে রোচতো তবে ভাতের থালা ঢিল মেরে উঠানে ছড়িয়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যেতো। আর তারপরই শাশুড়ির মুখের কটুক্তি আর তিরস্কার তাকে সহ্য করতে হতো। এসব ছিল নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা।
এইভাবে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, খোঁটা আর অপমান সহ্য করে মেহেরজানের সংসার জীবনের দিনগুলো অতিবাহিত হতে লাগলো।
একসময় তার কোল জুড়ে সন্তানাদি আসতে লাগলো। পোয়াতি মেহেরজান কেবলমাত্র এক বেলা কালিজিরা বাটা দিয়ে ভাত খেয়ে সন্তান লালন পালন করছে। এক ফোঁটা দুধ নয়, একটু মাছের ঝোল নয়, ফলমূলতো দূরের কথা!
তারপর অভাবের সংসারে কষ্টে শিষ্টে মেহেরজান সন্তান মানুষ করতে লাগলো। স্বামী তার গানবাজনা নিয়েই বেশি সময় কাটাতো। সংসারে তেমন একটা মন ছিল না। মেয়ে বড়ো হলে ধারদেনা করে তাদের বিয়েশাদি দিতে হতো। এসব দায়িত্ব মেহেরজানের যতটা ছিল তার সংসার বিরাগী স্বামীর ততটা ছিল না।
নিজেরা লেখা পড়া না জানলেও মেহেরজানের খুব ইচ্ছা ছিল ছেলেটাকে লেখা পড়া শেখায়।
ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে সংসারে তাকে আরও দ্বিগুণ খাটাখাটুনি করতে হতো। ছেলে স্কুল থেকে ফিরলে নিজে না খেয়ে তার খাবারটুকু ছেলের জন্য রেখে দিতো।
কলেজে পড়তে যাওয়ার জন্য প্রথম যেদিন তার ছেলে বাড়ি ছাড়বে, সেদিন মায়ে পুতরে সেকি কান্না!
মেহেরজান তার সাধ্যমত ছেলের পছন্দের খাবার রান্না করলো,নিজ হাতে মুখে তুলে খাওয়ালো, কাপড়চোপড়, বইপত্র গুছিয়ে ব্যাগে ভরে দিল, তারপর ছেলে সাথে নিয়ে পাড়াপড়শির বাড়ি যেয়ে মুরুব্বিদের দোয়া চেয়ে এলো। আঁচলে চোখের পানি মুছে ছেলেকে এগিয়ে দেয়ার জন্য বাড়ির সামনের হালট পারে খেজুর বাগান পর্যন্ত ছেলের পিছনে পিছনে চলে এলো। সেখান থেকে পূর্বদিকে মাইলখানেক পথ তখন একেবারেই ফাঁকা ছিল। বিরাট শস্যের মাঠ, ঘরবাড়ি- গাছপালা কিছুই ছিল না। ছেলেকে যতক্ষণ দেখা গেল, মেহেরজান ততক্ষণ খেজুর গাছে হেলান দিয়ে ছেলের পথ চেয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো। ছেলের বিদায়ের পর সে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে বাড়ি ফিরলো।
বর্তমান সময়ে মায়েদের একটাই কমন দুঃখ তাদের সন্তানরা কিছুই খেতে চায় না। আর মেহেরজানদের দুঃখ ছিল তারা তাদের সন্তানদের সময় মতো খেতে দিতে পারেনি।
মেহেরজানদের মতো অভাবী মানুষদের তখন সাধ- আহ্লাদ বলে কিছু ছিল না। কেবল মেহেরজান নয়,দরিদ্র কৃষক পরিবারের মেয়েররা তখন প্রসাধন সামগ্রীর কথা ভাবতেই পারেনি। প্রসাধন সামগ্রীর মধ্যে ছিল মাথা পরিস্কার করার জন্য একটি বাংলা সাবান, দাঁতের মাজন আর পায়ে পরার জন্য এক শিশি রক্তজবা আলতা। তাও বছরের সবসময় নয়,বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান বা তেহার পার্বণে সেই ব্যবস্থা থাকতো। সাবানের অভাবে কখনো কখনো তারা এটেল মাটি দিয়ে মাথা পরিস্কার করতো।
নারিকেল তেল না পেয়ে সরিষা বা ফুলের তেল মাথায় মাখতো। কলার ফ্যাতড়া, শিমূলের ফুল, তুলার খোসা ইত্যাদি রোদে শুখিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ক্ষার তৈরি করে তাই দিয়ে কাঁথা কাপড় ধোয়ার কাজ সারতে হয়েছে মেহেরজানদের। পরনে দু’টির বেশি কাপড় ছিল না তাদের। তোলা কাপড় না থাকার কারণে কোথাও যেতে হলে পরনের কাপড়খানা ধুয়ে শুকিয়ে তবে যেতে হতো। শীতের দিনে কোনো গরম জামাকাপড় ব্যবহার করতে তাদের দেখা যায়নি। খুব বেশি শীতে বড়ো জোর একটি পাতলা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে কাজ করেছে মেহেরজান। মাটির পাত্রে আগুন তুলে সেই আগুনে হাত পা সেঁকতে দেখা যেতো মেহেরজানদের। আষাঢ় শ্রাবন মাসে খালি পায়ে প্যাক কাদার মধ্যে হেঁটে হেঁটে কাজ করার কারণে পায়ের তলায়, আঙ্গুলের ফাঁকে ঘা হয়ে গিয়েছে। জুতা বা সেন্ডেল কী জিনিস তা চোখেও দেখতে পায়নি মেহেরজানের মতো গরীব ঘরের বধূরা। মাটির পাতিলের মধ্যে রাখা পাটখড়িতে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে তার ওপর কাসার থালা বসালে থালার নিচে খয়েরি রঙের ফোঁটা ফোঁটা কস জমতো। সেই কস কাদায় খাওয়া পায়ে লাগিয়ে কাদা পানিতে কাজ করেছে মেহেরজান। এতো কষ্ট করার পরও তাদের কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। যথাসাধ্য হাসি মুখেই দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছে মেহেরজানরা।
সংসারের যেসব কাজ মেহেরজানরা অবলীলায় সম্পন্ন করেছে, এখনকার মহিলাদের পক্ষে তা কল্পনারও অতীত। তখনো আমাদের এলাকায় ইরি ধানের আবাদ শুরু হয়নি।
আউস আমন ধানই ছিল তখন এ এলাকার প্রধান খাদ্য শস্য। আষাঢ় শ্রাবন মাসে বর্ষার নতুন পানিতে ধানক্ষেত টইটম্বুর হয়ে যেতো। শুরু হতো আউস ধান কাটা। কালা মানিক নামক আউস ধানের আবাদ আমাদের এলাকায় খুব বেশি হতো। ধান কাটার পূর্বে অধিকাংশ কৃষক পরিবারেই খাবার চালের অভাব দেখা যেতো।
সকাল থেকেই সারাদিন অঝোরে বৃষ্টি ঝরছে। ঘরে চাল বাড়ন্ত। মেহেরজানের স্বামী গেছে কামলা নিয়ে ধান কাটতে। প্রথম কাটা কয়েক আঁটি ধান রাখাল দিয়ে বাড়ি পাঠিয়েছে। মেহেরজান সেই ধান হাতে আঁচড়িয়ে খর থেকে আলাদা করে আগুনে সিদ্ধ করতো। এদিকে সারাদিন বৃষ্টি থাকার কারণে সেই সিদ্ধ ধান আবার চুলার আগুনে ভেজে ভেজে শুখাতে হয়েছে। তারপর সেই ধান ঢেঁকিছাটা করে সেই চালের ভাত রেঁধে বিকেল বেলা কামলাদের খাওয়াতে হয়েছে মেহেরজানকে। এই অবিশ্বাস্য কাজগুলোই তখন করতে হয়েছে মেহেরজানদের।
এরকমই ছিল পঞ্চশ ষাটের দশকের গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের মায়েদের গল্প।
লেখক – ছড়াকার, কবি, উপন্যাসিক মুহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমান।

