ডেস্ক রিপোর্ট: মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জবাসীর জন্য এক অবিস্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের দুর্বার প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মানিকগঞ্জ ত্যাগ করে ঢাকার দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এর মধ্য দিয়ে পাকহানাদারমুক্ত হয় মানিকগঞ্জ জেলা। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথে এটি ছিল এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট: মানিকগঞ্জ কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল:
ঢাকার পশ্চিমাঞ্চলে যোগাযোগ ও রসদ সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল মানিকগঞ্জ। ঢাকা–আরিচা মহাসড়ক, কালিগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীপথ এই জেলাকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ফলে পাক বাহিনী মানিকগঞ্জ সদর, সিংগাইর, ঘিওর ও দৌলতপুর এলাকায় শক্ত সামরিক অবস্থান গড়ে তোলে এবং বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে।
কিন্তু ডিসেম্বরের শুরু থেকেই দেশের সার্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি পাক বাহিনীর বিপক্ষে যেতে থাকে। ভারত–মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে একের পর এক জেলা শত্রুমুক্ত হয়। একই সময়ে মানিকগঞ্জেও মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
সিংগাইরের গোলাইডাঙ্গা ও আশপাশের যুদ্ধ:
মানিকগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধে সিংগাইরের গোলাইডাঙ্গা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র। এই এলাকায় পাক বাহিনী একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে স্থানীয় জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালাত।
• ডিসেম্বরের প্রথম ভাগে মুক্তিযোদ্ধারা গোলাইডাঙ্গা এলাকায় পরিকল্পিতভাবে গেরিলা আক্রমণ শুরু করেন।
• পাক বাহিনীর ক্যাম্প ও টহল দলের ওপর হঠাৎ হামলা।
• রসদ সরবরাহ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা।
• রাতের আঁধারে আঘাত হেনে দ্রুত সরে যাওয়া।
গোলাইডাঙ্গার এসব আক্রমণে পাক বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং তাদের মনোবল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে। এই যুদ্ধ সিংগাইরকে শত্রুমুক্ত করার পথ প্রশস্ত করে এবং মানিকগঞ্জ মুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মানিকগঞ্জের অন্যান্য যুদ্ধ ও প্রতিরোধ:
• সিংগাইরের পাশাপাশি মানিকগঞ্জ সদর, ঘিওর ও দৌলতপুর এলাকাতেও মুক্তিযোদ্ধারা সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
• পাক বাহিনীর টহল দল ও রসদবাহী যান লক্ষ্য করে হামলা।
• ঢাকা–আরিচা মহাসড়কে চলাচল ব্যাহত করা।
• নদীপথে নজরদারি ও প্রতিরোধ
দিনে অবস্থান বদল ও রাতে
গেরিলা আক্রমণ।
এসব সম্মিলিত অভিযানের ফলে পাক বাহিনী ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। স্থানীয় জনগণ খবর দেওয়া, আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসা সহায়তার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন।
১৩ ডিসেম্বর- চূড়ান্ত পরিণতি:
• ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বরের মধ্যে পাক বাহিনী নিশ্চিত হয় যে মানিকগঞ্জে অবস্থান ধরে রাখা তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়।
• ১৩ ডিসেম্বর ভোর থেকেই তারা মানিকগঞ্জ শহর ও আশপাশের ক্যাম্পগুলো গুটিয়ে নিতে শুরু করে। সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে ঢাকা–আরিচা মহাসড়ক ব্যবহার করে সংঘর্ষ এড়িয়ে পাক সেনারা ঢাকার দিকে পিছু হটে।
এদিন পাক বাহিনীর পলায়নের খবর ছড়িয়ে পড়তেই মানিকগঞ্জ শহরে বিজয়ের আবহ ছড়িয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করেন এবং বিভিন্ন স্থানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যে:
১৩ ডিসেম্বর একজন মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “গোলাইডাঙ্গা ও সিংগাইর এলাকায় লাগাতার হামলার পর পাক সেনারা ভেঙে পড়ে। ১৩ ডিসেম্বর সকালে দেখি তারা দলে দলে পালাচ্ছে—সেদিনই বুঝেছিলাম মানিকগঞ্জ মুক্ত।”
এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “পাক বাহিনী চলে যাওয়ার পর মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। কেউ কাঁদছিল, কেউ স্লোগান দিচ্ছিল—এ যেন দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্তির মুহূর্ত।”
ক্ষয়ক্ষতি ও আত্মত্যাগ:
যুদ্ধকালীন সময়ে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পাক বাহিনীর হাতে বহু নিরীহ মানুষ নির্যাতনের শিকার হন। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অসংখ্য পরিবার। অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এই ত্যাগই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথকে প্রশস্ত করে।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য:
মানিকগঞ্জের মুক্তি শুধু একটি জেলার মুক্তি ছিল না; এটি ছিল ঢাকার পতনের পূর্বাভাস। সিংগাইরের গোলাইডাঙ্গা সহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সফল প্রতিরোধে ঢাকার পশ্চিম দিক থেকে পাক বাহিনীর প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে, যা ১৬ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত বিজয়কে আরও ত্বরান্বিত করে।
স্মরণে ১৩ ডিসেম্বর:
প্রতি বছর ১৩ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জে মুক্ত দিবস পালিত হয়। শহীদদের স্মরণে দোয়া, স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং আলোচনা সভার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানো হয়।
সর্বোপরি, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের ঐক্য, সাহস ও আত্মত্যাগই ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ মানিকগঞ্জকে শত্রুমুক্ত করেছিল। সিংগাইরের গোলাইডাঙ্গা থেকে মানিকগঞ্জ সদর—সবখানেই প্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠেছিল। ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১—ঢাকামুখী পলায়নের মধ্য দিয়ে মানিকগঞ্জে বিজয়ের সূর্য উদিত হয়েছিল।

