
সাইফুল ইসলাম তানভীর:
জাতীয় সংসদ নির্বাচন একেবারে দ্বারপ্রান্তে। প্রচারণা শেষ, নীরব হয়ে এসেছে ভোটের মাঠ। তবে মানিকগঞ্জের গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার, চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: কোন আসনে কার পাল্লা ভারী?
একসময় মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর আসন্ন নির্বাচনে সেই হারানো অবস্থান পুনর্দখলের স্বপ্ন দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তবে এবারের নির্বাচনী বাস্তবতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় মাঠে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে ইসলামিক ঘরানার দল ও জোটগুলো। এর ফলে জেলার তিনটি সংসদীয় আসনেই তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন—কোথাও দ্বিমুখী, কোথাও ত্রিমুখী—রাজনৈতিক সমীকরণ।
মানিকগঞ্জ-১: বিএনপির বিভাজনে ত্রিমুখী লড়াই, সুযোগ খুঁজছে জামায়াত:
ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলা নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-১ আসনটি নদীবেষ্টিত ও যোগাযোগগত দিক থেকে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। এখানে মোট সাতজন প্রার্থী থাকলেও বাস্তবে লড়াই সীমাবদ্ধ তিন প্রার্থীর মধ্যে।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবীর ধানের শীষ ও সাংগঠনিক শক্তিকে ভরসা করে মাঠে থাকলেও দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী তোজাম্মেল হক তোজার প্রার্থিতায় দলীয় ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় জেলা বিএনপি ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে, যা দলের ভেতরের টানাপোড়েনকে আরও প্রকাশ্য করেছে।
এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে মরিয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিক। জেলার অন্য দুই আসনে জামায়াতের প্রার্থী না থাকায় জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরাও এই আসনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে ফল নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে ভোটার উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের ভোট বিভাজন।
মানিকগঞ্জ-২: ঐক্যবদ্ধ বিএনপি, তুলনামূলক স্বস্তির সমীকরণ:
সিংগাইর, হরিরামপুর ও সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-২ আসনে চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মইনুল ইসলাম খান শান্ত এই আসনে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত-সমর্থিত ১১ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি এস এম আব্দুল মান্নান লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে থাকলেও প্রচারণায় তার উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
স্থানীয়দের মতে, এই আসনে বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য ও প্রার্থীর পূর্ব পরিচিতি বড় ফ্যাক্টর। তবে ভোটের দিন ভোটার উপস্থিতি এবং গ্রামীণ ভোটব্যাংকের আচরণই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে।
মানিকগঞ্জ-৩: গণজোয়ারে বিএনপি, প্রায় একতরফা লড়াই:
সদর ও সাটুরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত মানিকগঞ্জ-৩ আসনকে জেলার রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নয়জন প্রার্থী থাকলেও বাস্তবে এখানে প্রতিযোগিতা অনেকটাই একপেশে বলে মত স্থানীয়দের।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা শুরু থেকেই ব্যাপক জনসমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন। বড় সমাবেশ, তৃণমূল পর্যায়ের সক্রিয়তা এবং বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা এই আসনে দলটির অবস্থানকে আরও শক্ত করেছে।
যদিও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ নূর রিক্সা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে রয়েছেন, স্থানীয়ভাবে তার পরিচিতি সীমিত। জামায়াতের সরাসরি প্রার্থী না থাকায় সমর্থনের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এই আসনে নারী ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। নারী ও তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন আফরোজা খানম রিতা। বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো অঘটন না ঘটলে এখানে বিএনপির জয় প্রায় নিশ্চিত।
শেষ কথা হলো – ভোটারদের হাতেই
সব মিলিয়ে মানিকগঞ্জের তিনটি আসনে তিন রকম বাস্তবতা স্পষ্ট।কোথাও ত্রিমুখী লড়াই, কোথাও দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আবার কোথাও প্রায় একতরফা সমীকরণ। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, নদীভাঙন, কৃষি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন—এসব ইস্যুতে দেওয়া প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত মূল্যায়ন হবে ব্যালটের মাধ্যমে।
পুরোনো ঘাঁটি পুনর্দখলে বিএনপি সফল হবে, নাকি মানিকগঞ্জে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে—তার চূড়ান্ত রায় মিলবে ভোটের বাক্স খুললেই।
