ডেস্ক রিপোর্ট: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৯টি দল এবার ভোটের মাঠে নামছে না। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর বড় একটি অংশ খুব সীমিত সংখ্যক আসনে প্রার্থী দিয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ২৯টি দল সর্বনিম্ন ১টি থেকে সর্বোচ্চ ২০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। অন্যদিকে, অন্তত ১০০টি আসনে প্রার্থী দিতে সক্ষম হয়েছে মাত্র ৫টি দল।
এবারের নির্বাচনে নিষিদ্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগ এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের বেশিরভাগ শরিক দল অংশ নিতে পারছে না। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় পর তুলনামূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হওয়ায় ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠবে না। তবে একই সঙ্গে তারা মনে করছেন, নিবন্ধিত হয়েও অনেক ছোট দলের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রার্থী সংকট দেশের রাজনীতিতে বিকল্প শক্তির বিকাশে বড় অন্তরায় হয়ে আছে।
উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি বড় দল অংশ নেয়নি। ২০১৮ সালে দলগুলো নির্বাচনে থাকলেও ভোটের অবাধতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। একই কারণে জাসদ ব্যতীত ১৪ দলের অন্যান্য শরিক দলও নির্বাচনের বাইরে রয়েছে।
ইসি সূত্র অনুযায়ী, যেসব ৯টি দল এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না, সেগুলো হলো—তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ, আওয়ামী লীগ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, ন্যাপ, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন। অন্যদিকে, নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে ২৩টি দল মাত্র ১ থেকে ১০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
প্রার্থী সংখ্যার হিসাবে বড় দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ৩৩১টি, জামায়াতে ইসলামী ২৭৬টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৬৮টি এবং জাতীয় পার্টি ২২৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদ ১০০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে সম্ভাব্য আসন সমঝোতার কারণে এই হিসাব চূড়ান্ত নাও থাকতে পারে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, অধিকাংশ ছোট দলের সাংগঠনিক কাঠামো খুবই দুর্বল। বছরের বেশিরভাগ সময় মাঠে কার্যক্রম সীমিত থাকলেও নির্বাচনের সময় হঠাৎ করেই তাদের তৎপরতা বাড়ে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলি মনে করেন, নিবন্ধিত দলের অন্তত ৩০টির ১০ শতাংশ আসনে প্রার্থী থাকা প্রয়োজন ছিল, যা বাস্তবে খুব কমই দেখা যায়। তাঁর ভাষায়, দেশে প্রকৃত অর্থে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠেনি। নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করলেও অনেক দল নিয়মিতভাবে সেই শর্ত বজায় রাখে না। তিনি পরামর্শ দেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণের বিধান থাকলে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।
অন্যদিকে, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দিয়ে কর্মসূচি সাজিয়ে নানা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। আবার অনেকের কাছে রাজনীতি আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রচারের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জোটগতভাবে নির্বাচন করলেও দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকায় আদর্শ ও জনভিত্তি ছাড়া কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক দল গঠনের প্রবণতা ভোটারদের মনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

