ইসলামের সূচনালগ্নে সপ্তম শতাব্দীর মক্কা ছিল সত্য ও মিথ্যার সংঘাতের এক উত্তাল ময়দান। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখন তাওহিদের আহ্বান নিয়ে মানুষের সামনে দাঁড়ালেন, তখন কোরাইশ নেতারা বিষয়টিকে সহজভাবে নেয়নি। তারা শুধু ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়নি, বরং নবীজির ব্যক্তিত্ব ও তাঁর ওপর অবতীর্ণ কোরআনকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও অপমানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল।
এই সামাজিক ও মানসিক টানাপোড়েনের সময়েই অবতীর্ণ হয় পবিত্র কোরআনের সুরা হিজর। সুরাটির প্রথম কয়েকটি আয়াতে একদিকে মুশরিকদের ধৃষ্ট আচরণের বর্ণনা রয়েছে, অন্যদিকে আল্লাহ তাআলা কোরআনের সংরক্ষণ বিষয়ে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন, যা মুসলিমদের জন্য চিরন্তন আশ্বাস হয়ে আছে।
নবীজিকে ‘উন্মাদ’ আখ্যা দেওয়ার পেছনের মানসিকতা
সুরা হিজরের ষষ্ঠ আয়াতে মক্কার কাফেরদের একটি অবমাননাকর বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে তারা রাসুল (সা.)-কে ‘মাজনুন’ বা উন্মাদ বলে কটাক্ষ করে। লক্ষণীয় বিষয় হলো—তারা স্বীকার করেছিল যে তাঁর ওপর ‘জিকির’ নাজিল হয়েছে বলে তিনি দাবি করছেন, কিন্তু সেই স্বীকারোক্তি ছিল বিশ্বাস থেকে নয়, বরং ব্যঙ্গের সুরে।
ইতিহাস ও তাফসির গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ রয়েছে, কোরাইশদের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা—যাঁরা সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন—এই ধরনের মন্তব্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁদের কাছে ওহির ধারণা ছিল কল্পনাপ্রসূত, কারণ অদৃশ্য জগতের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ—এই ধারণা তাদের যুক্তিবোধে ধরা দিত না।
‘আল-আমিন’ থেকে অপবাদ—বিরোধের গভীরতা
এটি ছিল চরম বৈপরীত্যপূর্ণ আচরণ। কারণ নবুয়তের আগের জীবনেই এই মুহাম্মদ (সা.)-কেই মক্কার মানুষ ‘আল-আমিন’ বা সর্বাধিক বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল। অথচ ইসলামের দাওয়াত শুরু হতেই সেই পরিচিত মানুষটিকেই মানসিকভাবে অস্থির প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল সত্যকে অস্বীকার করার একটি পুরোনো কৌশল—যখন বক্তব্যের জবাব দেওয়া সম্ভব হয় না, তখন বক্তার ব্যক্তিত্বকে আঘাত করা হয়।
ফেরেশতা দেখানোর অযৌক্তিক দাবি
বিদ্রূপের পাশাপাশি মুশরিকরা নবীজির কাছে অলৌকিক নিদর্শনের দাবিও তোলে। তারা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—তিনি যদি সত্যিই আল্লাহর রাসুল হন, তবে কেন ফেরেশতারা প্রকাশ্যে অবতরণ করে না?
এই দাবি বাহ্যত যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল অপমানসূচক চ্যালেঞ্জ। তাফসিরবিদদের মতে, তারা সত্য জানার উদ্দেশ্যে নয়, বরং আল্লাহর রাসুলকে হাস্যকর প্রমাণ করার লক্ষ্যেই এই প্রশ্ন করেছিল।
আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট জবাব
এই পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলা সুরা হিজরের পরবর্তী আয়াতগুলোতে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন—ফেরেশতা মানুষের বিনোদন বা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় না। বরং ফেরেশতা অবতরণ মানেই চূড়ান্ত ফয়সালার সময় উপস্থিত হওয়া। সে ক্ষেত্রে অবিশ্বাসীদের আর কোনো সুযোগ দেওয়া হতো না।
এর মাধ্যমে আল্লাহ মানবজাতির প্রতি তাঁর রহমতের দিকটিও স্পষ্ট করেন—অবিশ্বাস সত্ত্বেও তিনি মানুষকে সময় দেন, চিন্তার সুযোগ দেন।
কোরআনের সংরক্ষণ নিয়ে ঐতিহাসিক ঘোষণা
এই সব বিদ্রূপ ও চ্যালেঞ্জের জবাবে সুরা হিজরের নবম আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন একটি ঘোষণা দেন, যা শুধু সেই সময়ের জন্য নয়, বরং কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য—
“নিশ্চয়ই আমিই এই জিকির অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।”
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে কোরআনের নিরাপত্তা ও বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সব সন্দেহের অবসান ঘটে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যুগে যুগে মুসলিমরা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছে, সাম্রাজ্য ভেঙেছে, কিন্তু কোরআনের একটি আয়াতও পরিবর্তিত হয়নি।
জীবন্ত সংরক্ষণব্যবস্থা
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরআনের সংরক্ষণ কেবল লিখিত পাণ্ডুলিপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লক্ষ লক্ষ হাফেজের মুখস্থ বিদ্যা, একই উচ্চারণ ও ভাষাগত কাঠামোর ধারাবাহিকতা—সব মিলিয়ে এটি এক অনন্য ঐশী ব্যবস্থা।
যেখানে বহু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, সেখানে কোরআন আজও অবিকৃতভাবে পঠিত হচ্ছে—ঠিক যেভাবে তা মহানবী (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল।
চিরকালীন বার্তা
সুরা হিজরের এই আয়াতগুলো কেবল ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং এটি একটি স্পষ্ট বার্তা—সত্যকে বিদ্রূপ করে চাপা দেওয়া যায় না, আর আল্লাহর বাণী মানবীয় ষড়যন্ত্রের ঊর্ধ্বে।
এ কারণেই কোরআন আজও বিশ্বের সবচেয়ে পঠিত, মুখস্থ ও অনুসৃত গ্রন্থ—যার সংরক্ষক স্বয়ং মহান আল্লাহ।

