নিজস্ব প্রতিবেদক: সংস্কারের অভাবে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চারটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এখন দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও পিচ উঠে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও বর্ষায় হাঁটুপানি ও কাদায় চলাচল প্রায় অসম্ভব। আবার কোথাও সংস্কারকাজ শুরু হয়ে অভিযোগের কারণে দুই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ। এসব সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ চলাচল করলেও দীর্ঘদিনেও সংস্কারের উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কগুলোর বেহাল দশার কারণে একদিকে যেমন সময় ও যাতায়াত ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে রোগী পরিবহন, কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও শিক্ষার্থীদের চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই কোথাও কোথাও সড়ক পরিণত হচ্ছে কাদা-পানির পথে। এর মধ্যে ভারী যানবাহনের অবাধ চলাচল এবং নিম্নমানের সংস্কারকাজের অভিযোগও রয়েছে।
আশ্বাস নয়, দ্রুত সংস্কার চান এলাকাবাসী
সিংগাইরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বেহাল দশা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। তাদের দাবি, শুধু সংস্কারের আশ্বাস নয়, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শুরু ও শেষ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব সড়কে রোগী, শিক্ষার্থী ও কৃষকদের চলাচল বেশি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সড়কগুলোর মধ্যে দুদকের অভিযোগে প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ উপজেলার জামশা ইউনিয়নের বাংগালা বাজার থেকে মাটিকাটা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়কের সংস্কারকাজ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নির্মাণ প্রকৌশলী। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
কাজ শুরুর পর সড়কের দুই পাশের এজিংয়ে নতুন ইটের সঙ্গে পুরোনো ও পুনর্ব্যবহৃত ইট ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এতে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন স্থানীয়রা। পরে অভিযোগটি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পৌঁছালে সংস্কারকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও কাজ আর শুরু হয়নি।
সিংগাইর উপজেলার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও দোহারের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম সিংগাইর-মানিকনগর-সিরাজপুর সড়কের মানিকনগর থেকে সিরাজপুর অংশের প্রায় ১১ কিলোমিটার সড়কের অধিকাংশ জায়গায় পিচ, ইট, বালু ও সুরকি উঠে গিয়ে বড় বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। দীর্ঘদিনের বেহাল দশায় এটি এখন অনেকের কাছে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, সিংগাইর থেকে সিরাজপুর হাট পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মানিকনগর পর্যন্ত প্রায় নয় কিলোমিটার অংশের পাকাকরণের কাজ হালনাগাদ করা হয়। কিন্তু মানিকনগর থেকে সিরাজপুর বাজার পর্যন্ত অংশের সংস্কারকাজ দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক বছর আগে সড়কের বিভিন্ন ভাঙা অংশে নিম্নমানের রাবিশ ব্যবহার করে সংস্কার করা হলেও তা বেশি দিন টেকেনি। বর্তমানে পিচ উঠে গিয়ে অসংখ্য গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির সময় এসব গর্তে পানি জমে সড়কটি কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়।
অপরদিকে সিংগাইর উপজেলা সদর থেকে সাভারে যাতায়াতে সিংগাইর রোডের বিকল্প ও বাইপাস সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত ধল্লা ইউনিয়নের ভূমদক্ষিণ-খাসেরচর-ভাটিরচর সড়কটিও দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় পরিনত হয়েছে। প্রায় সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ ও বড় বড় গর্ত।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় যাতায়াতে সময় ও ব্যয় দুটিই বেড়েছে। বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
এদিকে দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা সাহরাইল-শোল্লা সড়কটি সংস্কারকাজ শুরু হলেও তা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় জনভোগান্তি বেড়েছে আগের তুলনায় দ্বিগুণ। বর্তমানে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি সায়েস্তা ইউনিয়নের সাহরাইল মোল্লা বাড়ি থেকে শোল্লার খতিয়া ব্রিজ পর্যন্ত বিস্তৃত।
স্থানীয়রা জানান, সড়কের বেহাল দশার কারণে কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি কৃষকের লোকসানও বাড়ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের চলাচলেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে রোগী পরিবহনে জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সড়কটির নিয়মিত ব্যবহারকারী মোস্তফা কামাল ফখরুল, ইসমত আরা ও সোলাইমান দেওয়ান বিকাশ বলেন, “এটি পার্শ্ববর্তী নবাবগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার অন্যতম প্রধান সড়ক। অথচ সড়কের বেহাল দসার কারণে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী ও রোগী পরিবহনসহ সব ক্ষেত্রেই আমরা মারাত্মক সমস্যায় ভুগছি।”
এ বিষয়ে সিংগাইর উপজেলা প্রকৌশলী মো. গোলাম সামদানী বলেন, ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে যেসব কাজ বন্ধ রয়েছে, সেগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে ঠিকাদারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের সঙ্গে করা কার্যাদেশ ও চুক্তি বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি, বন্ধ থাকা প্রকল্পগুলো পুনরায় টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, সংস্কারের অভাবে যেসব গুরুত্বপূর্ণ সড়কে মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে, সেসব সড়ক দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মানিকগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জামাল উদ্দিন বলেন, জেলার অনেক সড়ক সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো পর্যায়ক্রমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। চলতি বছর জেলার গুরুত্বপূর্ণ ও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর সংস্কারকাজ পর্যায়ক্রমে শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মঈনুল ইসলাম খান শান্ত বলেন, “জনগণের ভোগান্তি লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

