সময়পত্র ডেস্ক: চব্বিশের জুলাই। কোটা সংস্কারের দাবি ধীরে ধীরে রূপ নেয় এক দফার আন্দোলনে। রাজপথে তখন গুলির শব্দ, চারদিকে আতঙ্ক, আর যোগাযোগব্যবস্থায় নেমে আসে অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকার ভেদ করে মানুষের কাছে পৌঁছে যায় অন্য এক ভাষা—দেয়ালের ভাষা, গানের ভাষা, কবিতা ও শিল্পের ভাষা।
রাষ্ট্র যখন প্রতিবাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করার চেষ্টা করছিল, তখন দেয়াল হয়ে উঠেছিল ক্যানভাস। মেট্রোরেলের পিলার, ফ্লাইওভার কিংবা শহরের অলিগলির দেয়ালে রং-তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠতে থাকে ক্ষোভ, প্রতিবাদ, স্বপ্ন আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তরুণদের হাতে শিল্প তখন কেবল নান্দনিকতার বিষয় ছিল না; হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের শক্তিশালী মাধ্যম।
দেয়াল যখন হয়ে ওঠে জনগণের সংবাদপত্র
সেন্সরশিপ ও তথ্যপ্রবাহের সংকটের সময়ে শহরের দেয়ালগুলো যেন বিকল্প সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নেয়। রাতের আঁধারে কিংবা উত্তপ্ত রাজপথে তরুণ-তরুণীরা হাতে তুলে নেন রং ও তুলি। তাদের আঁকা ছবি ও লেখা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মুখে মুখে।
রংপুরে গুলির সামনে দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ আবু সাঈদের দৃশ্য হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অন্যতম প্রতীক। দেয়ালে দেয়ালে উঠে আসে—‘বিকল্প কে? তুমি, আমি, আমরা’, ‘আমার ভাইকে মারলি কেন?’, ‘পানি লাগবে পানি?’ কিংবা ‘স্বৈরাচারের পতন চাই’—এর মতো প্রতিবাদী বার্তা।
এসব বাক্য ছিল না নিছক দেয়াললিখন। প্রতিটি শব্দের সঙ্গে মিশে ছিল মানুষের ক্ষোভ, শোক ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। পথচারী, শিক্ষার্থী কিংবা রিকশাচালক—দেয়ালের সেই বার্তা সবাইকে মনে করিয়ে দিত, এই লড়াই কোনো একক গোষ্ঠীর নয়।
গানেই জেগে উঠেছিল রাজপথ
জুলাইয়ের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নেয় স্বাধীন গান ও হিপ-হপ। প্রচলিত গণসংগীতের সঙ্গে তরুণ প্রজন্ম যুক্ত করে নতুন ভাষা ও ছন্দ।
র্যাপার হান্নানের ‘আওয়াজ ওঠা’ গানটি আন্দোলনের সময়ে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। প্রতিবাদী কথাগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথে। গানটির কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার কণ্ঠ থামেনি—বরং তা আরও ছড়িয়ে পড়ে।
শেজানের ‘কথা কও’সহ বিভিন্ন শিল্পী ও ব্যান্ডের প্রতিবাদী গানও আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও স্পিকার, মোবাইল কিংবা মানুষের কণ্ঠে সেই গান পৌঁছে যায় এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
গান তখন শুধু বিনোদন ছিল না। তা হয়ে উঠেছিল ভয় কাটানোর ভাষা, এক হওয়ার আহ্বান এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস।
ডিজিটাল পর্দায় প্রতিবাদের নতুন ভাষা
রাজপথের পাশাপাশি ডিজিটাল জগতেও চলতে থাকে আরেক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। পোস্টার, ইলাস্ট্রেশন, কার্টুন ও ব্যঙ্গচিত্র মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
শিল্পীদের তৈরি এসব কাজ জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সহজ ও তীক্ষ্ণ ভাষায় তুলে ধরেছিল। কখনও একটি কার্টুন, কখনও একটি পোস্টার কিংবা কয়েকটি শব্দই হয়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।
ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও আগে ছড়িয়ে পড়া এসব ডিজিটাল শিল্প মানুষের স্মৃতি ও আলোচনায় থেকে যায়। অনলাইন থেকে অফলাইন—প্রতিবাদের এই যাত্রা জুলাইয়ের আন্দোলনকে দেয় ভিন্ন মাত্রা।
শিল্প যখন হয়ে ওঠে প্রতিরোধের হাতিয়ার
বাংলাদেশের ইতিহাসে সংকট ও সংগ্রামের সময়ে শিল্পের ভূমিকা নতুন নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গান, কবিতা, পোস্টার ও কার্টুন যেমন মানুষের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছিল, তেমনি চব্বিশের জুলাইয়েও শিল্প হয়ে ওঠে প্রতিবাদের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।
গ্রাফিতি, গান, কবিতা ও ডিজিটাল শিল্প মানুষকে শুধু আবেগতাড়িত করেনি; তাদের মধ্যে তৈরি করেছে সংযোগ ও ঐক্যের অনুভূতি। দেয়ালের একটি ছবি কিংবা একটি প্রতিবাদী গান অনেকের মনে যে সাহস তৈরি করেছিল, তা শেষ পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে।
জুলাইয়ের রক্তাক্ত দিনগুলো পেরিয়ে গেছে। দেয়ালের অনেক লেখা হয়তো মুছে গেছে, অনেক গ্রাফিতির রং সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়েছে। কিন্তু সেই শিল্পের ভাষা হারিয়ে যায়নি।
কারণ ইতিহাসের কিছু ছবি দেয়ালে আঁকা হলেও তার স্মৃতি মানুষের মনে থেকে যায়। চব্বিশের জুলাইও তেমনই এক অধ্যায়—যেখানে রং-তুলি, গান, কবিতা আর সৃজনশীলতা মিলেছিল প্রতিবাদের সঙ্গে।
সেই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়—প্রতিরোধের ভাষা সবসময় অস্ত্রের ভাষা নয়। কখনও একটি দেয়াল, একটি গান কিংবা একটি ছবি হয়ে উঠতে পারে সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষ্য।


