সময়পত্র ডেস্ক: মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের এক বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের জন্য সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি এখনো তাজা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে দুর্ঘটনার প্রকৃত ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
দুর্ঘটনার পর অনেক শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে। কেউ আবার নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে, কেউ নিজের দৈনন্দিন কাজ ও চিকিৎসার অংশ নিজেই সম্পন্ন করতে পারছে। অনেকের আত্মবিশ্বাসও আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে সবার পুনরুদ্ধারের পথ এক নয়।
এক বছর পরও অনেক শিক্ষার্থী দুঃস্বপ্ন, অনিদ্রা, আতঙ্ক ও মানসিক চাপের সঙ্গে লড়াই করছে। আগুনের দৃশ্য বা পোড়া গন্ধ অনেকের মনে এখনো ভয় তৈরি করে। হারিয়ে যাওয়া সহপাঠীদের স্মৃতি অনেকের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়।
প্রতিবেদনে ‘আকাশ’ (ছদ্মনাম) নামে এক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর সে নতুন স্কুলে ভর্তি হলেও রাতে ঘুমাতে পারে না। চোখ বন্ধ করলেই সামনে ভেসে ওঠে নিহত বন্ধুদের মুখ। শরীরের পোড়া দাগ নিয়ে অন্যের মন্তব্যেও অস্বস্তি বোধ করে সে। মানসিক চাপের কারণে তার খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনেও পরিবর্তন এসেছে।
অন্যদিকে ‘সাবিনা’ (ছদ্মনাম) নামে এক অভিভাবকের দিন কাটছে সন্তানের চিকিৎসা, ব্যায়াম, ড্রেসিং ও হাসপাতালে যাতায়াতের মধ্য দিয়ে। নিজের মানসিক ক্লান্তি লুকিয়ে প্রতিদিন সন্তানকে সাহস জোগানোর চেষ্টা করছেন তিনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শিক্ষার্থী নয়, তাদের অভিভাবকদের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
এখনো অনেক আহত শিক্ষার্থীকে নিয়মিত অস্ত্রোপচার, ফিজিওথেরাপি, প্রেশার গার্মেন্টস ব্যবহার এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। শরীরের দাগ ও পরিবর্তিত চেহারা নিয়ে অনেকে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে এবং সামাজিকভাবে সংকোচ বোধ করছে।
গত এক বছরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাকের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের সমন্বয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখা হয়েছে। পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্যও বিশেষ সহায়তা সেশন আয়োজন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল, হাসপাতাল, সরকার ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে আগাম সমন্বিত প্রস্তুতি গড়ে তোলা জরুরি।
তাদের মতে, বড় কোনো দুর্ঘটনার পর শুধু শারীরিক চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘ সময় ধরে সহমর্মিতা, নিয়মিত মানসিক সহায়তা এবং ট্রমা-সংবেদনশীল সামাজিক আচরণই ক্ষতিগ্রস্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

