বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, পারস্পরিক আস্থা, ভিসা, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা ও অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন—এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে সামনে রেখে আগামীকাল দিল্লি সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার থেকে ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র বলছে, ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার অংশগ্রহণের পর দিল্লির এই সফরকে ‘সম্পর্ক পুনর্গঠনের ধারাবাহিকতা’ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
দিল্লির অবস্থান বুঝতে চাইবে ঢাকা
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, এই সফরে বাংলাদেশ মূলত দিল্লির বর্তমান ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অবস্থান বুঝতে চাইবে। একইসঙ্গে ভারতকেও বার্তা দেওয়া হবে যে, ঢাকা এমন একটি স্বাভাবিক, মর্যাদাপূর্ণ ও পারস্পরিক আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক চায়, যা কোনো পক্ষের চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে।
মূলত ১১ ও ১২ এপ্রিল মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠিতব্য ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আগে দিল্লিতে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
কার কার সঙ্গে বৈঠক
দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ৭ এপ্রিল বিকেলে ঢাকা ছাড়বেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এরপর ৮ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। একইদিন তিনি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরির সঙ্গে।
‘স্বাভাবিক সম্পর্ক’ চায় বাংলাদেশ
দিল্লি সফর প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন,
“ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আগে ভারতে যাচ্ছি। দিল্লি সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। এসব আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হবে। আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই।”
আলোচনায় আসতে পারে যেসব ইস্যু
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফরের মূল গুরুত্ব থাকবে সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার ওপর। তবে পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব ইস্যুও আলোচনায় উঠে আসতে পারে।
সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সব শ্রেণির ভারতীয় ভিসা পুনরায় পূর্ণমাত্রায় চালু করা
- বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ভারতের আরোপিত কিছু বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার
- আকাশপথে তৃতীয় দেশে রপ্তানি সুবিধা
- জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো
- গঙ্গা ও তিস্তা নদীর পানিবণ্টন
- সীমান্তে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় রাখা
সূত্র বলছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হতে পারে—সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের সদিচ্ছার বাস্তব প্রতিফলন প্রয়োজন। বিশেষ করে ভিসা, বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা দূর করা হলে তা দুই দেশের জনগণের ওপর সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
‘অন্তর্বর্তী পর্ব’ পেরিয়ে নতুন সম্পর্কের ইঙ্গিত
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনকে সামনে রেখে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কও এখন নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে।
তাদের মতে, আওয়ামী লীগ আমলের সম্পর্কের সমীকরণে ফেরার সুযোগ নেই, বরং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে দুই দেশকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সম্পর্কের কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
ভারতীয় গণমাধ্যমেরও নজর
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট-এর এক বিশ্লেষণে এই সফরকে ‘ঢাকার সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। একইসঙ্গে অতীতের তুলনায় বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বকে দিল্লির প্রতি আরও সংবেদনশীল ও ইতিবাচক হিসেবেও মূল্যায়ন করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তার সফর
সব মিলিয়ে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর নয়; বরং এটি হতে যাচ্ছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তার সফর।

