২৫ মার্চ, ১৯৭১—বাংলার ইতিহাসে এমন একটি রাত, যা আজও শিহরণ জাগায়। এটি শুধু একটি তারিখ নয়, বরং একটি জাতির উপর নেমে আসা ভয়াবহতম বর্বরতার প্রতীক। সেই রাতেই অপারেশন সার্চলাইট-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চালায় পরিকল্পিত গণহত্যা।
দিনের আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসে আতঙ্কের অন্ধকার। রাজধানী ঢাকা হয়ে ওঠে মৃত্যুপুরী। রাত গভীর হওয়ার আগেই শুরু হয় ট্যাংক, মেশিনগান আর ভারী অস্ত্রের গর্জন। শহরের অলিগলি, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—কোথাও রেহাই মেলেনি।
বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এই বর্বর অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ইতিহাস সাক্ষী, সেই রাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অসংখ্য নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ইকবাল হল, জগন্নাথ হলসহ বিভিন্ন হল ও আবাসিক এলাকায় চালানো হয় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত সমাজকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে ছিল এ আক্রমণের সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য।
শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও একযোগে শুরু হয় দমন-পীড়ন। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় ঘরবাড়ি, নির্বিচারে হত্যা করা হয় নারী, পুরুষ, শিশু—কেউই রক্ষা পায়নি। সেই রাত ছিল মানবতার পরাজয়ের এক নির্মম চিত্র, যেখানে মানুষ মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় নিষ্ঠুরতার চরম সীমায়।
কিন্তু এই ভয়াল রাতই বাঙালির স্বাধীনতার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে তোলে। দমন-পীড়নের মাধ্যমে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা দমিয়ে রাখা যায়নি। বরং সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের ধারাবাহিকতাতেই শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—একটি নয় মাসের সংগ্রাম, যা এনে দেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।
আজ স্বাধীনতার বহু বছর পরও ২৫ মার্চ আমাদের কাছে শোক, বেদনা ও প্রতিরোধের প্রতীক। এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কখনোই সহজে অর্জিত হয়নি; এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য শহীদের রক্ত, ত্যাগ আর সংগ্রাম।
নতুন প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস তুলে ধরা, সেই রাতের ভয়াবহতা স্মরণ করা এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিকতা গড়ে তোলাই আজকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কারণ ইতিহাস ভুলে গেলে, সেই অন্ধকার আবারও ফিরে আসতে পারে।
২৫ মার্চের কালরাত তাই শুধু শোকের নয়—এটি জাগরণের, প্রতিরোধের এবং স্বাধীনতার অমোঘ চেতনার প্রতীক।

