সাইফুল ইসলাম তানভীর: রাজধানীর কিচেন গার্ডেন ক্ষ্যাত ঢাকার উপকণ্ঠ মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় অল্প সময়ের মধ্যে অধিক লাভজনক সম্ভাবনায় গাজর চাষে ঘটেছে নীরব বিপ্লব। দেশের অন্যতম প্রধান গাজর উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সিংগাইর এখন শুধু স্থানীয় বাজার নয়, বরং দেশের বিভিন্ন জেলা ও বড় শহরের সবজি বাজারের গুরুত্বপূর্ণ যোগানদাতা। কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিক-সবার সম্মিলিত শ্রমে সিংগাইরে গাজর চাষ এখন কৃষি অর্থনীতির একটি সফল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সিংগাইরকে এখন অনেকে গাজর গ্রাম নামে অভিহিত করে থাকেন। তবে বীজ বিপণনে সিন্ডিকেট, হিমাগারের স্বল্পতা এবং বিদেশ থেকে গাজর আমদানি তাদের লাভের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কৃষকদের মতে, এসব সমস্যার সমাধান হলে সিংগাইরের গাজর চাষ আরও বিস্তৃত হবে।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে চলতি মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ৯০৫ হেক্টর জমিতে গাজর আবাদ হয়েছে। পাইকারি বাজারে বর্তমান মূল্য গড়ে কেজি প্রতি ২০ টাকা ধরা হলে এ বছর সিংগাইরেই প্রায় ৯০ কোটি টাকার গাজর বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে স্থানীয়তের মতে বিক্রির পরিমাণ ১ শত কোটি টাকার ওপরে হবে। এতে ভাগ্য বদলাচ্ছে প্রায় ২৮ শত কৃষকের। এছাড়াও অসংখ্য গাজর ব্যবসায়ী ও শত শত শ্রমিকের হয়েছে কর্মসংস্থান ও আয়ের উৎস। গাজরের পাতা ও তৃতীয় গ্রেডের গাজর বড় ধরনের যোগান দিচ্ছে গরু-ছাগলের খাবার হিসেবেও।

বেলে-দোঁআশ মাটির কারণে সিংগাইর গাজর চাষের জন্য অত্যান্ত উপযোগী। আশ্বিন-কার্তিক মাসে বীজ বপনের পর মাত্র ৯০-১২০ দিনের মধ্যেই গাজর পরিপক্ব হয়। জয়মন্টপ, ধল্লা, সিংগাইর সদর, শায়েস্তা, জামির্ত্তা, তালেবপুর ও বায়রা ইউনিয়নসহ উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় এ বছর ব্যাপক আবাদ হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা জমিতে গাজর চাষে খরচ পড়ে ৫০-৬০ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘা থেকে ১২০ থেকে ১৫০ মণ পর্যন্ত গাজর পাওয়া যায়। বর্তমানে জমি থেকেই বিঘাপ্রতি গাজর বিক্রি হচ্ছে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায়। এতে বিগা প্রতি খরচ বাদে প্রায় ৪০-৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে, যা অন্য যেকোনো শীতকালীন ফসলের তুলনায় বেশি লাভজনক।
জয়মন্টপ ইউনিয়নের চরদুর্গাপুর এলাকার গাজর চাষী মোঃ শামিম বলেন, “আমি প্রায় দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে গাজর চাষ করছি। এবছরও নিজের জমি ও ভাড়া জমিসহ ১৫০ বিঘার মত জমিতে গাজর চাষ করছি। সবমিলে প্রায় ৭৫ লাখ মতো টাকা খরচ হয়েছে। গাজর বিক্রি চলমান। বর্তমান বাজার দরে বিক্রি করতে পারলে প্রায় ১ কোটি ৩৫ টাকার মতো বিক্রি করতে পারবো বলে আশা করছি। খরচের পরও ভালো লাভ থাকে। গাজরই আমার জীবনের অবস্থার পরিবর্তন এনেছে।”

একই এলাকার মোঃ মিজানুর রহমান জানান, “ আমি এবছর ৩৫ বিঘা জমিতে গাজর চাষ করছি। এতে আমার প্রায় ২১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আমি নিজেই শ্রমিক নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে ঢাকার বিভিন্ন পাইকারী বাজারে বিক্রি করি। বর্তমান বাজার দরে বিক্রি করতে পারলে প্রায় ৩২ লাখ টাকার মতো বিক্রি করতে পারবো বলে আশা করছি। গাজর চাষ করে আমি এখন অর্থনৈতিকভাবে বেশ স্বাবলম্বী।”
জয়মন্টপ ইউনিয়নের দেওলী গ্রামের গাজর চাষি মোঃ ইদ্রিস বেপারীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ২৮ বিঘা জমিতে গাজরের আবাদ করেছেন। এতে তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী গাজর বিক্রি করতে পারলে তিনি আশা করছেন ২৬ থেকে ২৮ লক্ষ টাকার মতো বিক্রি করতে পারবেন। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বীজ বপনের সময় গাজরের বীজ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে অস্বাভাবিকভাবে বেশি দামে বীজ কিনতে হয়। পাশাপাশি সার ও কীটনাশকের উচ্চমূল্যের কারণেও লাভের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়। সব সীমাবদ্ধতার পরও গাজর চাষ করে তিনি বর্তমানে স্বাবলম্বী হতে পেরেছেন। চরআজিমপুরের কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, “এ বছর ৯ বিঘা জমিতে গাজর করেছি। খরচের তুলনায় বিক্রি ভালো হয়েছে। অন্য ফসলের চেয়ে গাজরে লাভ বেশি।”
এদিকে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার গাজর চাষ ও বাজারজাতকরণে গতি এনেছে। মেশিনের সাহায্যে গাজর পরিষ্কারের ফলে একই শ্রমে আগের তুলনায় তিন গুণ বেশি গাজর বাজরজাতকরণের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের আয়ও বেড়েছে। রাজশাহীর বাঘা থেকে আসা গাজর পরিষ্কার করার শ্রমিক সর্দার মোঃ ফারুক হোসেন ও তার এক সহযোগী মোঃ লুথু বলেন, “আগে পা দিয়ে গাজর পরিষ্কার করতে হতো। এখন মেশিনে কাজ হয়। এতে কম সময়ে বেশি গাজর পরিষ্কার করা যাচ্ছে। প্রতিদিন আমরা ১০-১২ জনে ৭০ কেজি ওজনের ২৫০ বস্তা পর্যন্ত গাজর জমি থেকে তুলে পরিষ্কার করে ট্রাকে তুলে দিতে পারি। এতে আমাদের প্রতি জনের প্রতিদিন ১ হাজার থেকে থেকে ১২ শত টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে।”
ভূমদক্ষিণ গ্রামের গাজর ব্যবসায়ী মো. আজমত আলী বলেন,“আমরা কৃষকের জমি থেকেই গাজর কিনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করি। শুরুতে দাম ভালো থাকলে লাভ হয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই বৃষ্টির ঝুঁকি থাকে।” একই কথা জানান ব্যবসায়ী আবেদ আলী ও মোহাম্মদ আলী। তাদের ভাষ্য,“দাম স্থিতিশীল থাকলে এবং গাজর নষ্ট না হলে এই মৌসুমে ব্যবসা ভালো যাবে।”
দেউলী গ্রামের গাজর ব্যবসায়ী মোঃ মোতালেব বলেন, চলতি মৌসুমে তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ১০০ বিঘা জমির গাজর ক্রয় করেছেন। বর্তমান বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে এ বছর গাজর ব্যবসায়ে তিনি ভালো লাভবান হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. হাবিবুল বাশার চৌধুরী বলেন, “সিংগাইরের মাটি ও জলবায়ু গাজর চাষের জন্য অত্যান্ত উপযোগী। কৃষকরা আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করায় উৎপাদন ও গুণগত মান দুটোই বেড়েছে।
পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে এই অঞ্চলের গাজর দেশের সবজি অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে।”

