সময়পত্র ডেস্ক: তরুণ প্রজন্মের কাছে কে-পপ বা কোরিয়ান পপ মিউজিক এখন বেশ পরিচিত একটি নাম। শুধু শোনা নয়, অনেকেই এই ধারার গান ও মিউজিক ভিডিওর ভক্ত। বিশেষ করে বিটিএসের মতো জনপ্রিয় ব্যান্ডের নাম প্রায়ই উঠে আসে। ভাষা বুঝতে না পারলেও আকর্ষণীয় সুর, পরিবেশনা ও দৃশ্যায়নের কারণে বিশ্বজুড়ে দিন দিন বাড়ছে কে-পপের জনপ্রিয়তা।
সম্প্রতি কে-পপের এই বিশ্বব্যাপী সাফল্যের কারণ খুঁজে দেখেছে টাইম ম্যাগাজিন। তাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার এই সংগীতধারা নিজ দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। একই সঙ্গে চীনা পপ বা সি-পপ কেন এখনও মূলত নিজস্ব বাজারকেন্দ্রিক রয়ে গেছে, সেটিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
টাইমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কে-পপের সাফল্যের পেছনে শুধু ভালো গান, আকর্ষণীয় শিল্পী কিংবা দৃষ্টিনন্দন মিউজিক ভিডিওই কাজ করেনি। এর পেছনে ছিল সুপরিকল্পিত বাজার কৌশল। কোন ধরনের সংগীত আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, সে বিষয়ে শুরু থেকেই গবেষণা ও পরিকল্পনা করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদনশিল্প।
কে-পপের অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছানো। নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজারকে প্রধান লক্ষ্য না বানিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের জন্য শিল্পী ও সংগীত তৈরি করা হয়েছে। শিল্পীদের দীর্ঘ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিদেশি গীতিকার ও কোরিওগ্রাফারদের যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে গান ও মিউজিক ভিডিওর মানও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।
কে-পপের বিশ্বব্যাপী বিস্তারের বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্পী সাইয়ের ‘গ্যাংনাম স্টাইল’। গানটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং কে-পপকে বিশ্বজুড়ে আরও পরিচিত করে তোলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারও কে-পপের জনপ্রিয়তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইউটিউব, ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এমন শ্রোতাদের কাছেও কে-পপ পৌঁছে যায়, যাদের কাছে প্রচলিত টেলিভিশন বা রেডিওর মাধ্যমে পৌঁছানো কঠিন ছিল। শ্রোতারা শুধু গান শুনেই থেমে থাকেননি; তারা বিভিন্ন ফ্যান কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এতে অনলাইনে দ্রুত বিস্তার লাভ করে কে-পপ।
অন্যদিকে, চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার অনেক ক্ষেত্রে সি-পপের আন্তর্জাতিক বিস্তারের পথে ভিন্ন ধরনের বাস্তবতা তৈরি করেছে। দেশটির শিল্পীরা নিজ দেশের বিপুল দর্শক ও বাজার থেকেই বড় ধরনের বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জনের সুযোগ পান। ফলে বিদেশি শ্রোতাদের রুচি বোঝা কিংবা তাদের লক্ষ্য করে আলাদা করে বড় বিনিয়োগ করার প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
সি-পপের আরেকটি সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। চীনে ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের মতো বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম সীমিত বা বন্ধ থাকায় চীনা শিল্পীদের কনটেন্ট বিদেশি দর্শকদের কাছে পৌঁছানো তুলনামূলক কঠিন। ফলে অনেক শিল্পী আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তে নিজেদের দেশের দর্শকদের মধ্যেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখছেন।
টাইমের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, চীনের বিনোদনশিল্পে সরকারি নিয়ন্ত্রণও সি-পপের আন্তর্জাতিক বিস্তারে প্রভাব ফেলেছে। শিল্পী ও ভক্তদের অনলাইন কর্মকাণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ, আইডল তৈরির বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া এবং বিনোদন খাতে নানা বিধিনিষেধ আরোপের কারণে সৃজনশীলতার পরিসর সংকুচিত হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, কে-পপের বিশ্বজয়ের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারকে লক্ষ্য করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শিল্পীদের প্রশিক্ষণ, মানসম্মত প্রযোজনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার বড় ভূমিকা রেখেছে। বিপরীতে, সি-পপের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধতা এবং বিনোদন খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ এর বৈশ্বিক বিস্তারে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

