নিজস্ব প্রতিনিধি (মানিকগঞ্জ):
বর্ষার পানি নামলেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ঝিটকার নৌকার হাট। একসময় ইছামতী নদীকেন্দ্রিক জনপদের প্রধান নৌ-বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই হাটে এখনও প্রতি বর্ষায় জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলা থেকে মানুষ নৌকা কিনতে ভিড় করেন। নদী-খাল, বিল ও জলাবদ্ধ এলাকায় যাতায়াত, কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে কাঠের নৌকার বিকল্প না থাকায় বর্ষার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে নৌকার চাহিদাও।
ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা ঝিটকার এই হাট স্থানীয়দের কাছে শুধু একটি বাজার নয়, বরং শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা নদীমাতৃক বাংলার ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক। প্রতি শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসা এই হাটে বর্ষার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চলে নৌকার বেচাকেনা। একসময় যেখানে কয়েক শতাধিক নৌকা উঠত, বর্তমানে সেখানে গড়ে ৬০ থেকে ১০০টি নৌকা আসে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত কয়েক বছরে বর্ষায় পর্যাপ্ত পানি না হওয়ায় নৌকার চাহিদা কমে গেছে। তবে চলতি মৌসুমে টানা বৃষ্টিতে পানি বাড়ায় আবারও হাটে ফিরেছে প্রাণ।
শনিবার (১ আগস্ট) সরেজমিনে ঝিটকা নৌকার হাট ঘুরে দেখা যায়, হাটজুড়ে সারি সারি ছোট-বড় ডিঙি নৌকা। ক্রেতারা নৌকার কাঠ, গড়ন, ভারসাম্য ও দাম যাচাই করে কিনছেন। স্থানীয় কারিগরেরা রেইনট্রি, কড়ই, চাম্বল ও মেহগনি কাঠ দিয়ে বিভিন্ন আকারের নৌকা তৈরি করেন। আকার ও কাঠের মানভেদে প্রতিটি নৌকার দাম ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ছোট ডিঙি নৌকার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি।
বর্ষা মৌসুমে জলপথের বিস্তৃতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ জনপদে ছোট কাঠের নৌকার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে এখনও হাজারো পরিবার বর্ষাকালে যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও জীবিকার জন্য কাঠের নৌকার ওপর নির্ভরশীল।
নৌকার কারিগর পরিতোষ বলেন, “দুজন মানুষ মিলে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুটি নৌকা তৈরি করতে পারি। কাঠ নির্বাচন, আগুনে সেঁকে বাঁকানো, জোড়া লাগানো—প্রতিটি ধাপেই দক্ষতা ও সময় লাগে। কিন্তু কাঠের দাম বেড়েছে, দক্ষ শ্রমিকও কমে গেছে। আবার কয়েক বছর ধরে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কাজও আগের তুলনায় অনেক কম।”
আরেক কারিগর সুমন বলেন, “বর্ষা মৌসুমেই আমাদের মূল কাজ। প্রতিদিন এক হাজার টাকা হাজিরা পাই। বছরের বাকি সময়ে বিভিন্ন বাড়িতে দিনচুক্তিতে কাঠের আসবাব ও অন্যান্য জিনিস তৈরি করে জীবিকা চালাই।”
চরাঞ্চল থেকে নৌকা কিনতে আসা মোজাফফর বলেন, “আমাদের এলাকায় বর্ষাকালে কাঠের নৌকার কোনো বিকল্প নেই। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া—সবকিছুর জন্য নৌকা লাগে। ছোট নৌকাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি।”
গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের কৃষক জমির উদ্দিন বলেন, “বর্ষা এলেই নৌকা লাগে। যাতায়াত থেকে শুরু করে গরুর জন্য ঘাস কাটাসহ সব কাজেই নৌকা ব্যবহার করি। এবার দামও মোটামুটি সহনীয়।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এই হাটকে ঘিরে শুধু নৌকা বিক্রেতাই নন, কাঠ ব্যবসায়ী, করাতকল, বৈঠা প্রস্তুতকারক, রং ব্যবসায়ী, কামার ও দিনমজুরসহ শতাধিক মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে বর্ষা মৌসুমে ঝিটকার স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নৌকা ব্যবসায়ী মন্টু মণ্ডল বলেন, “আমাদের ব্যবসা পুরোপুরি পানির ওপর নির্ভরশীল। পানি বেশি হলে বিক্রি বাড়ে, পানি কমলে লোকসান গুনতে হয়। কয়েক বছর ধরে পানির অভাবে ব্যবসা খুব একটা ভালো হয়নি। এবার বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।”
ব্যবসায়ী সুশান্ত হালদার বলেন, “বর্ষার প্রায় দুই মাস আগে থেকেই নৌকা তৈরির প্রস্তুতি শুরু করি। এবার মেহগনি, কড়ই ও চাম্বল কাঠের নৌকার চাহিদা বেশি। তবে কাঠ ও লোহার সরঞ্জামের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে।”
ঝিটকা নৌকার হাটের ইজারাদারের প্রতিনিধি মো. রিপন বলেন, “টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পানি বাড়ায় গত হাটে ভালো বিক্রি হয়েছে। আজ পানি কিছুটা কম থাকায় বিক্রি আগের হাটের তুলনায় কম। তবে পানি বাড়তে থাকলে সামনে আরও ভালো বেচাকেনার আশা করছি।”

